
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। আজ রোববার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। শাহপরান হলের খাবার নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মন্তব্যের জেরে এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রদলের দুই নেতার মারধরের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ।
শিক্ষার্থীরা শাহপরান হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানান। বাকি দুই দাবি হলো হামলার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা এবং আহত শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীরা বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি ক্যাম্পাস ঘুরে গোলচত্বরে যায়। সেখানে একটি সমাবেশ হয়।
শাহপরান হলের খাবারের মান নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মন্তব্য করেন সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের (২০২৩-২৪) শিক্ষার্থী খাইরুল খন্দকার। এর জেরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক হাসিবুর রহমান ও সহদপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ। পরে রাতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
আজ সমাবেশে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমির হোসেন বলেন, ‘আগে আবাসিক হলকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে ছাত্রলীগের একটা গ্রুপ ওই শিক্ষার্থীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করত। আমরা একই চিত্র আবার লক্ষ করছি।’
একই বিভাগের একই বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন বলেন, গতকাল রাতে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার পর তাঁরা তদন্তের জন্য তিন দিনের সময় মেনে নিয়েছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে ভাষায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তাঁরা সেটার নিন্দা জানাচ্ছেন। এটি সুষ্ঠু তদন্ত কমিটির ভাষা হতে পারে না। তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের ভাষা সংশোধনের দাবি জানান। তা না হলে তাঁরা কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
এদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় দুই ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। আজ দুপুরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমের সই করা এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে খাইরুল কেন আপত্তিকর অভিযোগ তুলেছেন, সে জন্য শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তাঁকে ডাকেন হাসিবুর ও তারেক। তাঁদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। দুজন খাইরুলকে পেটান। তিনি বুক, মাথা ও হাতে গুরুতর আঘাত পান।
ভুক্তভোগী খাইরুল খন্দকার ঘটনার বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার তিনি হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্যানটিনের খাবারের বাজে অবস্থা নিয়ে প্রাধ্যক্ষকে ‘মেনশন’ দিয়ে অভিযোগ করেন। এর পরের দিন ১৭ জুলাই শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারেক ও হাসিবুর তাঁকে প্রাধ্যক্ষের কাছে ‘সরি’ বলতে বলেন। শনিবার রাতে গেটে খাবার খেতে গেলে হাসিবুর তাঁকে ডেকে পাঠান।
খাইরুলের ভাষ্য, ‘তখন আমি কেন প্রাধ্যক্ষের কাছে সরি বলি নাই, তা জানতে চায় হাসিবুর। আমাকে সে হুমকি দেয়। এ সময় তারেক বলে, “এই ব্যাটা তুই আমারে চিনস? থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব।” তখন হাসিবুর ও তারেক আমাকে বেধড়ক মারধর করেন।’
পরে সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা খাইরুলকে বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা গেলে আহত শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা তারেক রহমানের ভাষ্য, ‘হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে কথা বলায় প্রাধ্যক্ষ স্যার একটু মন খারাপ করছেন। তখন আমরা এ নিয়ে খাইরুলকে বোঝাচ্ছিলাম। কিন্তু সে জুনিয়র হয়েও আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করে। যেটা আমাদের কাছে সিনিয়র হিসেবে খুব খারাপ লেগেছে। তখন এক কথা, দুই কথায় বিষয়টা বড় পর্যায়ে চলে গেছে। সে তেড়ে এসে আমার শরীরে তার হাত টাচ করে। তখন হাসিবুর বাধা দিতে গেলে সেটা হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়। এতে হাসিবের চশমা ভেঙে গেছে, তার হাত কেটে গেছে, তার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদল নেতা হাসিবুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি।
শনিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মী ও ছাত্রদলের একাংশের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ ঘটনায় জড়িত নেতাদের শাস্তির দাবি জানান তাঁরা। পরে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অতিথি ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান ও বিক্ষোভ করেন। উপাচার্য খায়রুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের সামনে এলে তাঁদের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়। উপাচার্য দাবি পূরণের বিষয়ে আশ্বাস দিলে অতিথি ভবনের সামনে থেকে চলে যান বিক্ষোভাকারীরা।