
চট্টগ্রাম-১৪ আসন (চন্দনাইশ-সাতকানিয়ার একাংশ) দীর্ঘদিন ধরেই কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক ‘প্রভাবের’ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই রাজনীতিবিদের নাম আসনটির সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় ভোটের অঙ্কে তাঁর ব্যক্তিগত ‘প্রভাব’ ছিল নির্ধারক। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। অলির সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই, তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে বিএনপি।
এবার অলি আহমদ প্রার্থী হননি। তাঁর ছেলে ওমর ফারুক জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’র সমর্থন নিয়ে ছাতা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পারিবারিক সুনাম, পুরোনো কর্মী বাহিনী ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের জোরে তিনি শক্ত অবস্থানেই ছিলেন। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমদ ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। ব্যবধান ১ হাজার ২৬ ভোট।
অলি আহমদ প্রথম এ আসন থেকে নির্বাচিত হন ১৯৮০ সালের উপনির্বাচনে। পরে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির হয়ে জয় পান। ২০০৬ সালে দল ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন এবং ২০০৮ সালে ছাতা প্রতীকে আবার নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাবই এ আসনের নির্বাচনী সমীকরণ নির্ধারণ করেছে। সে হিসেবে এবারের ফল ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে দলীয় প্রতীকের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত, এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
এবারের লড়াই ছিল মূলত ধানের শীষ বনাম ব্যক্তিগত প্রভাবের। অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও ভোটের মাঠে তাঁকে একদিকে বাবার ঐতিহ্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে, আবার নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণেরও চাপ ছিল।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমদ দলীয় সমর্থন পেলেও শুরুতে সংগঠনের ভেতরে কিছু অসন্তোষ ছিল। দলের দুজন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, যা ভোট বিভক্তির আশঙ্কা তৈরি করেছিল। তবে চূড়ান্ত ফল বলছে, সেই বিভক্তি বড় প্রভাব ফেলেনি।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটারদের বড় অংশ প্রার্থীর চেয়ে প্রতীককে প্রাধান্য দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয়তা এবং তৃণমূলের সংগঠিত উপস্থিতি প্রচারে গতি আনে। বিশেষ করে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর কর্মীদের মধ্যে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়, তা মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ছিল। অলির ব্যক্তিগত প্রভাব অটুট থাকলেও ভোটের দিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিএনপির সংগঠিত প্রস্তুতি তাদের এগিয়ে রাখতে সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
তবে ভোট শেষে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ভিডিও বার্তায় কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দাবি করেন, বিকেল চারটার পর কয়েকটি কেন্দ্রে জোর করে ঢুকে ব্যালট পেপার বাক্সে ঢোকানো হয়েছে। তিনি হাশিমপুর তরুণ সংঘ স্কুল, হাশিমপুর বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দোহাজারী আবদুর রহমান হাইস্কুলের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিষয়টি পরিকল্পিত হতে পারে।
একই অভিযোগ করেন এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, অতিরিক্ত ব্যানার টাঙিয়েছেন এবং ভোটের দিন কয়েকটি কেন্দ্রে জাল ভোটের চেষ্টা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা পাননি বলে দাবি তাঁর।
অন্যদিকে বিজয়ী প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে এবং মানুষ ধানের শীষের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলই এই জয়।
এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল দুই প্রার্থীর মধ্যে। শুরু থেকেই কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে পালাবদল দেখা গেছে। কোথাও এগিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী, কোথাও ছাতা প্রতীকের। শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হয়।০
নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। পুরুষ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৭ জন, নারী ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৫ এবং হিজড়া ভোটার ১ জন। মোট বৈধ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭২৮টি। ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। প্রার্থী ছিলেন ৮ জন। ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মো. সোলাইমান পেয়েছেন ২২ হাজার ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ৩ হাজার ৬৩০ এবং শফিকুল ইসলাম পেয়েছেন ১ হাজার ১৬৫ ভোট।