
সাতক্ষীরার সুলতানপুর বড় বাজার এখন আমে সয়লাব। বাজারজুড়ে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, বোম্বাই, গোলাপ খাসসহ বিভিন্ন জাতের আমভর্তি সারি সারি ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপ। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ৫ মে থেকে দেশি জাতের আম সংগ্রহ শুরু হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল শুক্রবার থেকে বাজারে পুরোদমে আমের সরবরাহ শুরু হয়েছে।
তবে মৌসুমের শুরুতেই আমের দাম কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। তাঁদের অভিযোগ, বাজারে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সাতক্ষীরায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। মোট ৫ হাজার ২৯৯টি বাগানে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন চাষি আম চাষ করেছেন। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৮০ মেট্রিক টন বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য আছে। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ।
জেলা প্রশাসনের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ৫ মে থেকে গোবিন্দভোগ, বোম্বাই ও গোলাপ খাসসহ দেশি জাতের আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ১৫ মে থেকে বাজারে আসবে হিমসাগর। আর ল্যাংড়া আম সংগ্রহ শুরু হবে ২৭ মে। আগামী ৫ জুন থেকে বাজারজাত করা হবে আম্রপালি ও মল্লিকা আম।
গতকাল সদর উপজেলার ফিংড়ি, ব্রহ্মরাজপুর, ধুলিহর, ইটাগাছা, বাঁশদহ, পুরাতন সাতক্ষীরা, আখড়াখোলা ও লাবসা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাগানে গাছে থোকায় থোকায় আম ঝুলছে। কোথাও চাষিরা আম পেড়ে ক্রেট ভর্তি করছেন। কোথাও আবার পাইকাররা বাগান থেকেই আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ফিংড়ি এলাকার আমচাষি সোনা মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে আমি বাগান কিনেছি। গত তিন মাস পরিচর্যা করতে গিয়ে আরও প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। গাছে ফলন ভালো হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে লাভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে আমের দাম কমে গেছে। এতে শঙ্কায় আছি।’
একই এলাকার আমের ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, সুলতানপুর বড় বাজারের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চাষি ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষকেই লোকসান গুনতে হবে। যে আম উৎপাদনে প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, সেটি অনেক সময় ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হিমসাগর আমের দাম ভালো না পেলে অধিকাংশ চাষি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
মাঠপর্যায়ের চাষিরা বলছেন, উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বর্তমান বাজারদর তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারছে না। মৌসুমের শুরুতেই দাম পড়ে যাওয়ায় সামনে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমের বাজার নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সুলতানপুর বড় বাজারের ব্যবসায়ী ফজর আলী বলেন, সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী ৫ মে থেকে আম পাড়া শুরু হলেও আজ শনিবারই মূলত বাজারে পর্যাপ্ত আম উঠেছে। বর্তমানে জাতভেদে প্রতি মণ আম ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা বড় বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওশন আলী প্রথম আলোকে বলেন, আম বেচাকেনার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সব দিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। তবে বাজারে জায়গা কম হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যানজট হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগের বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ আম প্রতি মণ প্রায় দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে সাধারণত চাষিদের লোকসান হওয়ার কথা নয়।