
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জিতেছে বিএনপি। আর একটি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে হারিয়ে দিয়েছেন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান। স্বতন্ত্র পরিচয়ে তিনি হাঁস প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন।
কিশোরগঞ্জ–৫ (বাজিতপুর ও নিকলী) আসনে হাঁস প্রতীকে শেখ মজিবুর রহমান ৭৯ হাজার ৬০৪ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের সৈয়দ এহসানুল হুদা পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৪৫০ ভোট।
কিশোরগঞ্জ–৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা কিছুদিন আগেও বিএনপির কেউ ছিলেন না। বাংলাদেশ জাতীয় দল নামে একটি দলের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এবারের নির্বাচনে প্রথম দফায় বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে নিজের বাবার গড়ে তোলা দল বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর ধানের শীষের চূড়ান্ত মনোনয়ন পান।
অন্যদিকে শেখ মজিবুর রহমান লম্বা সময় ধরে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি। প্রথমে দলীয় মনোনয়ন পেলেও পরে চূড়ান্ত মনোনয়নে দলের তালিকায় তাঁর নাম আসেনি।
বিএনপির নেতা–কর্মীরা বলেন, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা শেখ মজিবুর রহমানকে প্রথমে মনোনয়ন দিয়ে পরবর্তী সময় বাদ দেওয়ায় দলের নেতা–কর্মীদের একটি অংশ কষ্ট পান। দলে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদাকে মনোনয়ন দেওয়ায় বাজিতপুর ও নিকলীর নেতা–কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। এর প্রভাব পড়েছে ভোটে।
নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে যাওয়ায় প্রথমে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় শেখ মজিবুর রহমানকে। এই ক্ষোভ থেকে দলের অনেকে প্রকাশ্যে শেখ মজিবুর রহমানের হাঁস প্রতীকের পক্ষ নেন। দলীয় প্রার্থী রেখে বিদ্রোহীর পক্ষ নেওয়ায় কয়েক দফায় শতাধিক উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির পদধারী নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
নেতা–কর্মীরা বলেন, বেশির ভাগ নেতা–কর্মীর বহিষ্কার শেখ মজিবুর রহমানের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। বহিষ্কৃত নেতারা এই নির্বাচনকে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরির নির্বাচন হিসেবে নেন। ফলে সবাই আটঘাট বেঁধে শেখ মজিবুর রহমানের পক্ষে ভোটে নামেন।
হাঁস প্রতীকের সমর্থক বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘গণবহিষ্কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না—ফলাফল দিয়ে আমরা তা বুঝিয়ে দিতে পেরেছি। এই গণবহিষ্কার আমাদের নেতা–কর্মীদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আমি নিজেকে এখনো বিএনপির একজন মনে করি।’
কিশোরগঞ্জের অন্য পাঁচ আসনের ফলাফল
কিশোরগঞ্জ–১ (সদর ও হোসেনপুর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৫ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী হেদায়াতুল্লাহ হাদী। তিনি ১ লাখ ১ হাজার ১৩২ ভোট পেয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ–২ (পাকুন্দিয়া ও কটিয়াদী) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. জালাল উদ্দীন বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৯ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মোড়ল। তিনি ১ লাখ ২০ হাজার ৯৭৫ ভোট পেয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ–৩ (করিমগঞ্জ ও তাড়াইল) আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুক বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ১ লাখ ১২ হাজার ৪৬৬ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের শ্যালক জেহাদ খান। তিনি ১ লাখ ২ হাজার ৪৭৬ ভোট পেয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ–৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের বেসরকারি ফলাফলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির আলোচিত নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। তিনি ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৭২ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাবেক কেন্দ্রীয় শিবির নেতা রোকন রেজা শেখ। তিনি ৫৭ হাজার ৮২৯ ভোট পেয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ–৬ (ভৈরব ও কুলিয়ারচর) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বেসরকারি ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম। তিনি ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৫৯ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী আতাউল্লাহ আমীন। তিনি ৪৪ হাজার ৯৫ ভোট পেয়েছেন।