
আবদুল জব্বারের বলীখেলার আয়োজন থেকে মেলার সূত্রপাত। খেলা শুরু হয় বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগরের হাত ধরে। ১৯০৯ সাল। সময়টা ছিল ব্রিটিশ শাসনের উত্তাল দিন। চারদিকে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছিল। তরুণদের সংগঠিত করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই জব্বার সওদাগর বেছে নেন এক অভিনব পথ। খেলার মাধ্যমে শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তুলতে চালু করেন এই বলীখেলা। এবার আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা পা দিয়েছে ১১৭ বছরে। ধীরে ধীরে বলীখেলাকে কেন্দ্র করে বসতে থাকে মেলাও।
চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা পেরিয়ে লালদীঘির দিকে এগোতেই বোঝা যায়, এই সড়ক আর সাধারণ দিনের মতো নেই। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান, মাঝখানে মানুষের ঢল। কেউ ধীর পায়ে হাঁটছেন, কেউ ভিড় ঠেলে এগোচ্ছেন। কোথাও বাঁশির সুর, কোথাও বিক্রেতার হাঁকডাক। এই সবকিছুর কেন্দ্রে—আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলাকে ঘিরে শুরু হওয়া বৈশাখী মেলা।
গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে শতবর্ষী এই মেলা। তবে অন্তত দুই দিন আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা দোকান সাজিয়ে বসেছেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে থেকে লালদীঘি মোড়, কে সি দে রোড, সিনেমা প্যালেস মোড় হয়ে কোতোয়ালি মোড় পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেল এক প্রাণবন্ত, কোলাহলমুখর জনসমুদ্র। পরিবার নিয়ে কেউ এসেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। আবার অনেকেই একাই ভিড়ের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছেন। কারও হাতে কেনাকাটার ব্যাগ, কারও চোখে শুধু দেখার আগ্রহ।
আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে বসে ছিলেন মোহাম্মদ সাজু। সামনে সাজানো একতারা, দোতারা, ডুগডুগি। গরমে শরীর ভিজে গেছে ঘামে। তবু থামছেন না তিনি। মাঝেমধ্যে একতারা হাতে তুলে সুর তুলছেন। সেই সুরে আশপাশের মানুষ থমকে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ শুনছেন, কেউ দাম জিজ্ঞাসা করছেন।
কুষ্টিয়ার লালনের আখড়ার পাশে বড় হওয়া সাজুর জীবনের সঙ্গে এই বাদ্যযন্ত্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ছোটবেলায় শিখেছিলেন। এখন নিজেই তৈরি করেন, আবার বিক্রিও করেন। প্রায় এক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চট্টগ্রামের এই মেলায় আসছেন টানা ৮ বছর। বিক্রির ফাঁকে তিনি বললেন, ‘এখানে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের সঙ্গে দেখা–সাক্ষাৎ হয়।’
প্রতিবছর ১২ বৈশাখ এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিসর বেড়েছে। আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। বলীদের লড়াই দেখতে, আবার মেলা ঘুরতেও এখানে এসে হাজির হন হাজারো মানুষ
সাজুর মতো আরও হাজারো বিক্রেতা এবার মেলায় বসেছেন। লালদীঘি মাঠ ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান। ঘরের প্রয়োজনীয় সব পণ্যই পাওয়া যাচ্ছে এখানে। খাট–পালং থেকে ঝাড়ু, থালাবাসন, দা-বঁটি-ছুরি, আয়না—সবই আছে। শিশুদের খেলনা, রঙিন পুতুল, দোলনা—সব মিলিয়ে এক বিশাল পসরা।
হাজারি গলির দিকে ঢুকতেই ভিড় আরও ঘন হয়ে এল। হঠাৎ ভেসে আসে বাঁশির সুর। সেই সুরের টানে এগিয়ে গেলে দেখা মেলে রাজশাহীর গগন মণ্ডলের। চার দশক ধরে বাঁশি বিক্রি করছেন তিনি। সামনে নানা আকারের বাঁশি সাজানো। মাঝেমধ্যে নিজেই বাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেন।
বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি হিসাব দেন না। শুধু বলেন, ‘দশটা বাঁশি বিক্রি হলেই চলে যায়।’ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ নাদিম মাহমুদ একটি বাঁশি কিনে নিলেন। জানালেন, কয়েক দিন ধরে বাঁশি শেখা শুরু করেছেন।
আরও একটু এগোতেই দেখা গেল ঝাড়ুর স্তূপের ওপর বসে আছেন আবদুল মান্নান। চন্দনাইশ থেকে আসা এই মানুষটি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মেলায় আসছেন। ঝাড়ু বিক্রিই তাঁর পেশা। তিনি বললেন, ‘ঝাড়ু তো সবারই লাগে, তাই চাহিদা কমে না। প্রথম দিনেই তিন হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। সামনে আরও হবে।’
লালদীঘি মোড়ে এসে মেলার আরেক রূপ চোখে পড়ে। এখানে খাবারের দোকানগুলোর ভিড়। মণ্ডা, মিঠাই, চানাচুর, টফি, আচার—নানা ধরনের খাবারের পসরা। ছোট ছোট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভিড় করছে এখানে। কেউ খাচ্ছে, কেউ আবার বায়না ধরছে।
শত বছর পেরিয়ে আজও এই বলীখেলা টিকে আছে। সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু লালদীঘির মাটিতে দাঁড়িয়ে বলীদের লড়াই এখনো মানুষকে টানে। সেই টান শুধু খেলায় নয়; ইতিহাসের, শিকড়েরও।
খাবারের দোকানি মো. রাজ্জাক বললেন, প্রতিবছরই তিনি হাটহাজারী থেকে এখানে আসেন। ছোটদের উপস্থিতি থাকায় বিক্রিও ভালো হয়। তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন শিশু খাবার খাচ্ছিল।
মেলার ভেতরে আরও এগোতেই দেখা গেল কাগজের ফুল নিয়ে বসে আছেন জয়নাল মিয়া। নানা রঙের ফুল সাজানো। কেউ কিনছেন, কেউ শুধু দেখছেন। এই মেলায় এমন অনেক পণ্য আছে, যা প্রয়োজনের পাশাপাশি আনন্দেরও অংশ।
ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ে ঘর সাজানোর নানা জিনিসপত্রের পসরা। কে সি দে রোডজুড়ে মাটির তৈরি ফুলদানি, টব, শোপিস, রঙিন পুতুল সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। কোথাও বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি, চেয়ার কিংবা ছোট তাক; আবার কোথাও দেয়ালসজ্জার সামগ্রী। কেউ কিনছেন নতুন করে ঘর সাজানোর জন্য, কেউবা ছোট জায়গাতেও একটু সবুজ ছোঁয়া আনতে টব নিয়ে দরদাম করছেন। একেকটি দোকানের সামনে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, এই মেলা শুধু প্রয়োজন মেটানোর জায়গা নয়, মানুষের ঘর ও জীবনে একটু রং, একটু সৌন্দর্য যোগ করারও এক বড় উপলক্ষ।
ফিরিঙ্গিবাজারের ফারহানা বেগম মেয়েকে নিয়ে ফুলদানি ও টব কিনছিলেন। দরদাম করে একটি ফুলদানি ও একটি টব কিনলেন। এরপর তিনি বলেন, বাগান করার শখ তাঁর পুরোনো। ছোট জায়গাতেও গাছ লাগানোর চেষ্টা করেন। এবার বেলি ফুল লাগানোর পরিকল্পনা করছেন। বারান্দাতে এ টব বসাবেন।
অন্যদিকে, আসকারদিঘীর বাসিন্দা শ্যামলী আক্তার ও সাইফুল ইসলাম দম্পতি কিনছিলেন দা, বঁটি ও ছুরি। তাঁরা বললেন, সামনে কোরবানির ঈদ। তুলনামূলক কম দামে এসব জিনিস এখানে পাওয়া যায়, তাই আগে থেকেই কিনে রাখা সুবিধাজনক।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মেলার চিত্র আরও জমে ওঠে। দোকানে দোকানে আলো জ্বলে ওঠে। ভিড় আরও বাড়ে। মানুষের চলাচল থামে না। বরং আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। তরুণেরা মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ লাইভ করছেন।
মেলায় শিশুদের জন্য আলাদা এক জগৎ তৈরি হয়েছে। রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা, বাঁশের তৈরি গাড়ি, ঘুড়ি, ছোট ছোট পুতুল, দোলনা—সবকিছুই সাজানো সারি সারি দোকানে। কোথাও আবার শব্দ করা খেলনা, আলো জ্বলা গাড়ি কিংবা হাতে ঘোরানো চরকিও দেখা গেছে। এসব দোকানের সামনে সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল শিশুদেরই। কেউ খেলনা হাতে নিয়ে টানাটানি করছে, কেউ মা–বাবার কাছে বায়না ধরছে। অনেক অভিভাবকও না করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কিনে দিয়েছেন। বিক্রেতারাও শিশুদের মন টানতে নানা কৌশলে খেলনা দেখাচ্ছিলেন।
মেলায় আসা অনেকেই বললেন, এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি একটি সামাজিক মিলনমেলা। বছরের এই সময়টায় শহরের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এখানে এসে জড়ো হন। কেউ আনন্দ খুঁজতে, কেউ প্রয়োজন মেটাতে, কেউ আবার পুরোনো স্মৃতি ছুঁতে।
প্রতিবছর মেলা হয় তিন দিন ধরে। এবার আগামী রোববার এসএসসি পরীক্ষা। ফলে মেলা সেদিন ভোরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবু অনেক ক্রেতা হয়তো সেদিনও পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসবেন। এই মেলা কারও জন্য এটি জীবিকার বড় উৎস, কারও জন্য উৎসব। লালদীঘির এই বৈশাখী মেলা তাই শুধু একটি আয়োজন নয়; এটি এক ধারাবাহিক ঐতিহ্য, যা সময়ের সঙ্গে বদলেছে, কিন্তু তার প্রাণশক্তি হারায়নি।
আবদুল জব্বারের বলীখেলার ইতিহাস শত বছরের পুরোনো। খেলার সূত্রপাত বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগরের হাত ধরে। ১৯০৯ সাল। সময়টা ছিল ব্রিটিশ শাসনের উত্তাল দিন। চারদিকে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছিল। তরুণদের সংগঠিত করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই জব্বার সওদাগর বেছে নেন এক অভিনব পথ।
খেলার মাধ্যমে শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তুলতে চালু করেন এই বলীখেলা। এবার আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা পা দিয়েছে ১১৭ বছরে। মল্লযুদ্ধের আকারে তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো, লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি করা-এই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এটি ছিল একধরনের প্রস্তুতি, যা প্রকাশ্যে বিনোদনের মতো দেখালেও ভেতরে ছিল প্রতিরোধের বীজ।
ইতিহাসের পাতায় এর ছাপও আছে। বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম গ্রন্থে অনুশীলন সমিতির কার্যক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে কলকাতায় প্রমথনাথ মিত্রের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই গোপন বিপ্লবী সংগঠন তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করত। লাঠিখেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ-এসব ছিল তাদের প্রশিক্ষণের অংশ। চরিত্র গঠনের শিক্ষাও দেওয়া হতো সমান গুরুত্ব দিয়ে।
চট্টগ্রামেও সেই প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বলীখেলার মতো আয়োজনগুলো হয়ে ওঠে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র। একই সঙ্গে গোপন প্রস্তুতির মঞ্চ। ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ছড়িয়ে দিতে এটি ছিল এক কার্যকর মাধ্যম। ধীরে ধীরে এই বলীখেলা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথমে এটি ছিল মূলত তরুণদের শক্তি প্রদর্শনের জায়গা। পরে তা রূপ নেয় জনমানুষের উৎসবে। লালদীঘির ময়দান হয়ে ওঠে এই উৎসবের কেন্দ্র।
চট্টগ্রামের নগরের লালদীঘি ময়দানে প্রতি বৈশাখে যে জনসমুদ্র জমে, তার কেন্দ্রে থাকে এক খেলা-বলীখেলা। বাইরে থেকে দেখলে এটি কুস্তির মতোই মনে হয়। কিন্তু এটি শুধু শরীরের শক্তির লড়াই নয়, বরং ইতিহাস আর প্রতিরোধের এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা।
আজ শনিবার বেলা তিনটায় ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে রিংয়ে নামবেন ১০৮ জন বলী। এখান থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট উঠবে একজনের মাথায়।
গত বছর বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন কুমিল্লার মো. শরীফ ওরফে বাঘা শরীফ। এবারও তিনি খেলায় অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া গতবারের রানার্সআপ মো. রাশেদ ওরফে রাশেদ বলীও এবার রিংয়ে উঠবেন। তাঁদের নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।
প্রতিবছর ১২ বৈশাখ এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিসর বেড়েছে। আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। বলীদের লড়াই দেখতে, আবার মেলা ঘুরতেও এখানে এসে হাজির হন হাজারো মানুষ। তবে এই ধারাবাহিকতা সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একবার এ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাস মহামারির কারণেও টানা দুই বছর বলীখেলা হয়নি। তবু প্রতিবারই বিরতির পর নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছে এই আয়োজন।
এখন এটি শুধু একটি খেলা নয়। এটি চট্টগ্রামের একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। লালদীঘির ময়দানে দাঁড়িয়ে যখন বলীরা লড়াই করেন, তখন সেই দৃশ্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে শত বছরের ইতিহাস।
শত বছর পেরিয়ে আজও এই বলীখেলা টিকে আছে। সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু লালদীঘির মাটিতে দাঁড়িয়ে বলীদের লড়াই এখনো মানুষকে টানে। সেই টান শুধু খেলায় নয়; ইতিহাসের, শিকড়েরও।