
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন সারা বিশ্ব প্রিয় দল ও তারকাদের নিয়ে মেতেছে, ঠিক এ সময়ে পিরোজপুরে একদল শিশু-কিশোরের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দিন-রাত চেষ্টা যাচ্ছেন তরুণ এক প্রশিক্ষক। নিজের খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নটি অপূর্ণ থাকলেও নতুন প্রজন্মের ফুটবলার তৈরির লক্ষ্যে কাজটি করে যাচ্ছেন জামান ইসলাম (২৪)।
পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জামানের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছোটবেলা থেকেই। খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নে তিনি নিয়ম করে অনুশীলন করতেন। কিন্তু ২০১৯ সালে ঘটে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। একটি ম্যাচ খেলতে গিয়ে আঘাত পান পায়ে, এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং মাঠ থেকে দূরে সরে যান।
এ প্রসঙ্গে জামান বলেন, ‘ইনজুরির পর মনে হয়েছিল, আমার সব স্বপ্ন শেষ। পরে এলাকার ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে বুঝতে পারি, আমি নিজে না খেলতে পারলেও ওদের তো কিছু শেখাতে পারি। সেখান থেকেই শুরু।’
এ ভাবনা থেকে ২০২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নিজ এলাকা পিরোজপুর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড–সংলগ্ন একটি বালুর মাঠে মাত্র দুই শিশুকে নিয়ে জামান ইসলামের ফুটবল প্রশিক্ষণের যাত্রা শুরু হয়। স্বল্প পরিসরে শুরু হওয়া সে উদ্যোগ এখন বেশ পরিচিতও পেয়েছে। বর্তমানে তাঁর অধীনে প্রায় ৬০ শিশু-কিশোর নিয়মিত ফুটবল প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় পিরোজপুর সরকারি স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন জামান ইসলাম। প্রতি ব্যাচে প্রায় ২০ শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নেয়। একবার ভর্তি হলে নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ ছাড়াই দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় তারা। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসিক ১০০ টাকা নেওয়া হয়। জামান ইসলামের দাবি, সেই অর্থের বড় অংশই আবার ব্যয় করা হয় শিক্ষার্থীদের পেছনে। ফলে কার্যত প্রায় বিনা পারিশ্রমিকেই তাদের ফুটবল শেখাচ্ছেন তিনি।
সম্প্রতি শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশমূলক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’–এর ফুটবল টুর্নামেন্টে জামানের কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাঁচ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। উপজেলা পর্যায়ে যে দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, সেখানে তাঁর তিন ছাত্র আছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও এ সাফল্য স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
চার মাস ধরে জামান ইসলামের কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে শিক্ষার্থী সিনজিম মাহমুদ। সে বলে, ‘এখানে এসে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আগে শুধু খেলতাম, এখন নিয়ম মেনে অনুশীলন করি। ভবিষ্যতে বড় কোনো প্রতিযোগিতায় খেলতে চাই।’
পিরোজপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনজিমের মতো আরও অনেক শিশু প্রতিদিন মাঠে আসে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কারও স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা, কারও স্বপ্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
তবে এসব অর্জনের পরও সীমাবদ্ধতা আছে। জামানের প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই। ফলে বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তবু থেমে যেতে চান না তিনি। তাঁর স্বপ্ন, একদিন একটি নিবন্ধিত ফুটবল একাডেমি গড়ে পিরোজপুরের শিশু-কিশোরদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ ব্যবস্থা করবেন।
জামান ইসলাম বলেন, ‘আমি হয়তো খেলোয়াড় হিসেবে অনেক দূর যেতে পারিনি। কিন্তু আমার শিক্ষার্থীদের কেউ যদি কোনো দিন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামে, সেটিই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, দুই শিশুকে নিয়ে শুরু হওয়া ছোট একটি উদ্যোগ আজ ৬০ শিশুর স্বপ্নের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে পিরোজপুরে ভবিষ্যতের ফুটবলার তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন তরুণ এই প্রশিক্ষক।
পিরোজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক আবদুস কুদ্দুস খান বলেন, বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জামানের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সে যে কাজ করছে, তা পিরোজপুরের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ।