যশোর সদর উপজেলার মুড়লীতে অবস্থিত মোগল আমলের স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন ইমামবাড়া। সম্প্রতি তোলা
যশোর সদর উপজেলার মুড়লীতে অবস্থিত মোগল আমলের স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন ইমামবাড়া। সম্প্রতি তোলা

দানবীর হাজি মুহম্মদ মুহসীনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ২২৩ বছরের ইমামবাড়া

যশোর সদর উপজেলার এ ইমামবাড়া হাজি মুহম্মদ মুহসীনের ইমামবাড়া নামেই এলাকার মানুষের কাছে বেশি পরিচিত।

যশোরের মুড়লীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২২৩ বছরের পুরোনো একটি সাদা ভবন। সেই সাদা ভবনই মুড়লী ইমামবাড়া (মহররমের অনুষ্ঠান উদ্‌যাপনের জন্য নির্মিত ভবন বা সম্মেলনকক্ষ)। এ ইমামবাড়া হাজি মুহম্মদ মুহসীনের ইমামবাড়া নামেই এলাকার মানুষের কাছে বেশি পরিচিত। মোগল আমলের স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন এ ইমামবাড়া। এর অবস্থান যশোর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, যশোর সদর উপজেলার মুড়লীর ওই ইমামবাড়া হাজি মুহম্মদ মুহসীনের সৎবোন মন্নুজান খানম ১৮০২ সালে নির্মাণ করেছিলেন। ইমামবাড়াটি মূলত আয়তাকার একটি সভাকক্ষ। এর আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ১৮ দশমিক ২৯ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫ দশমিক ২৪ মিটার। ইমামবাড়ার অভ্যন্তর ভাগ ১০টি স্তম্ভের দ্বারা তিন সারিতে আনুভূমিকভাবে বিভক্ত। খিলানগুলো কিছুটা খাঁজকাটা ও নকশাযুক্ত। সাধারণ পলেস্তারার ওপর ফুলের নকশা রয়েছে। ছাদ সমতল। ছাদের সিলিংয়ে ফুলের স্টাকো নকশা রয়েছে। সামনে চার ধাপে সিঁড়ি রয়েছে। এটি শিয়া মুসলমানদের একটি অন্যতম পাদপীঠ।

প্রায় ২২৩ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ এটি সরকারের প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইয়ের (১৯১৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত) দ্বিতীয় খণ্ডে ‘শিল্প ও স্থাপত্য’ অধ্যায়ে মুড়লীর ইমামবাড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই বইয়ের তথ্যমতে, মুড়লীর ইমামবাড়া মুহম্মদ মুহসীনের মোতোওয়ালিদিগের (ওয়াক্ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপক) সময়ে নির্মিত হয়। এটি সমতল ছাদবিশিষ্ট।

বিভিন্ন বই ও পত্রপত্রিকার সূত্রে জানা যায়, হাজি মুহম্মদ মুহসীন জন্মগ্রহণ করেন ১৭৩২ সালের ১ আগস্ট। তাঁর বাবা হাজি ফয়জুল্লাহ। বিভিন্ন বইপুস্তক ঘেঁটে জানা যায়, হাজি মুহসীনের পূর্বপুরুষেরা এসেছিলেন সুদূর ইরান বা পারস্য থেকে। তবে তাঁদের আদি বাস ছিল আরবে। দিল্লির মসনদে তখন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। সম্রাটের বিচারালয়ের সম্মানিত সদস্য ছিলেন আগা মোতাহার।

আওরঙ্গজেব আগা মোতাহারের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যশোর, হুগলি, নদীয়া ও ২৪ পরগনা জেলার প্রচুর জমি তাঁকে জায়গির দেন। পরে আগা মোতাহার হুগলিতে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে মন্নুজান। তবে কিছুদিন পর মারা যান আগা মোতাহার। একপর্যায়ে আগা মোতাহারের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেন মুহসীনের বাবা হাজি ফয়জুল্লাহ। মন্নুজান হয়ে যান মুহসীনের সৎবোন। তাঁদের মা–বাবা মারা গেলে ভাইবোন হয়ে পড়েন অভিভাবকহীন। বিশাল সম্পত্তির মালিক হন মন্নুজান। একসময় তিনি বিয়ে করেন আগা সালাউদ্দিনকে, যিনি কর্মসূত্রে সে সময় ইরান থেকে এসে হুগলিতে বাস শুরু করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান মন্নুজান তাঁর সম্পত্তি মুহসীনকে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু এতে রাজি হননি মুহসীন। অবশেষে মন্নুজান ১৮০২ সালে সমুদয় সম্পত্তি লন্ডনের সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে মুহসীনকে দান করেন। পরে মুহসীন ১৮০৬ সালের ২০ এপ্রিল হুগলিতে এক অসিয়তনামা রেজিস্ট্রি করেন।

দানবীর হাজি মুহম্মদ মুহসীন ইমামবাড়া কার্যকরী সমন্বয় পরিষদের সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, মুড়লীর ইমামবাড়া প্রায় ২২৩ বছরের পুরোনো। এখানে বছরে পাঁচটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়। সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হয় পবিত্র আশুরা ও ইমাম হোসাইনের চল্লিশা অনুষ্ঠানে।

জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, ঐতিহাসিক ওই ইমামবাড়া পুরাকীর্তি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতাধীন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পুরাকীর্তিটির সংরক্ষণ করে। প্রয়োজনে সংস্কারও করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে পুরাকীর্তিটি সংস্কার করা হয়।