অদম্য মেধাবী-২০২৬ (৮)

দিনে শ্রমিকের কাজ, রাতে পড়াশোনা; এরপরও বিদ্যালয়ে একমাত্র জিপিএ–৫ জাহিদুলের

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।

কেউ দিনে শ্রমিকের কাজ করে রাতে বই খুলেছে, কেউ নিজের পড়ার খরচ জোগাতে ছোটদের পড়িয়েছে। আবার কেউ একসময় পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও শিক্ষকদের সহায়তায় ফিরে এসেছে। মেধা ও পরিশ্রমে তারা এসএসসির বাধা পেরিয়েছে। এখন কলেজে পড়াশোনার খরচ জোগানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাদের পরিবার। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন কত দূর এগোবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।

দিনে শ্রমিক, রাতে পড়াশোনা জাহিদুলের

জাহিদুল ইসলাম

দিনে একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ শেষে রাতে তিন-চার ঘণ্টা পড়ত জাহিদুল ইসলাম। দশম শ্রেণিতে ওঠার পর স্কুলে যাওয়ার আর সুযোগ ছিল না। প্রয়োজনীয় বই কিনতে না পেরে বন্ধুদের কাছ থেকে বইয়ের ছবি তুলে এনে পড়ত। এত কিছুর মধ্যেও এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পায় সে।

কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের আদমপুর ইউনিয়নের টুকারকান্দি গ্রামের ছেলে জাহিদুল। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আদমপুর দেওয়ান আলী উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি থেকে এবার একমাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

জাহিদুলের বাবা নজরুল ইসলাম ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করতেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চাকরি ছেড়ে গবাদিপশু পালনের আশায় গ্রামে ফিরে আসেন। দুই লাখ টাকা দিয়ে একটি গাভি ও একটি ষাঁড় কেনেন। কিছুদিনের মধ্যে অজ্ঞাত রোগে মারা যায় ষাঁড়টি।

সাত মাসের মধ্যে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নজরুল ইসলাম। বাবার মৃত্যুর এক মাসের মধ্যে মারা যায় পরিবারের আরেকটি গরুও। সংসারে নেমে আসে বড় সংকট। তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে জাহিদুল। সংসারের অভাব দেখে কখনো কৃষিশ্রমিক, কখনো ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করে। নবম শ্রেণিতে উঠে নিজে প্রাইভেট না পড়লেও অন্যদের প্রাইভেট পড়াত। সেই আয়েই চলত নিজের পড়াশোনা।

জাহিদুল তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইদের মধ্যে অন্যরা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। এখন এক ভাই ও অসুস্থ মাকে নিয়ে তাদের সংসার। মা গোলাপ বানুর মাসে তিন হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়।

জাহিদুল বলে, অনলাইনে ক্লাস করার জন্য ভাই তাকে একটি ফোন কিনে দিয়েছিলেন। বন্ধুদের কাছে গিয়ে বইয়ের ছবি তুলে আনত। অধ্যায়ের উত্তর ডাউনলোড করে পড়ত। এসএসসির ফরম পূরণেও সংকটে পড়েছিল সে। তখন শিক্ষকেরা কোচিং ফি হিসেবে দেড় হাজার টাকা নেননি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, ছেলেটি নিয়মিত স্কুলে আসতে পারত না। কাজ করতে হতো। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সে। এই ফল তার নিজের চেষ্টা ও মেধার অর্জন।

এসএসসি পরীক্ষা শেষে আবার নতুন কাজে যোগ দেয় জাহিদুল। এখন মুন্সিগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করে। দিনে ১৪ ঘণ্টার কাজে মাসে বেতন সাড়ে ১২ হাজার টাকা। বেতনের একটি অংশ ব্যয় হয় ঋণের টাকা পরিশোধ করতে। এখনো ঋণের ৬০ হাজার টাকা বাকি।

জাহিদুল বলে, ‘আমার ইচ্ছা বুয়েটের যেকোনো বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। ভাবছি ১৪ ঘণ্টা কাজ করে কলেজের পড়াশোনা চালাব কী করে। আবার কাজ ছেড়ে দিলে পড়াশোনার খরচ জোগানোর তো উপায় নেই।’

স্মরণিকার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার

স্মরণিকা শিকদার

কনিকা শিকদারের নিজের পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়ে যায়। তাই মেয়ের পড়াশোনায় কোনো কমতি রাখতে চাননি তিনি। মেয়ে স্মরণিকা শিকদার যতক্ষণ পড়ত, পাশে বসে থাকতেন মা। এভাবে পড়ে ফরিদপুর সদরের খলিলপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

স্মরণিকাদের বাড়ি ফরিদপুর সদরের মাচ্চর ইউনিয়নের বাকচর এলাকায়। তাঁর বাবা স্বরূপ শিকদার খলিলপুর বাজারে ছোট একটি মুদিদোকান চালান। দুই ভাইবোনের মধ্যে স্মরণিকা বড়।

প্রতিদিন গড়ে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করত স্মরণিকা। কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বাড়তি সময় বের করে স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে বুঝে নিত।

স্মরণিকার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বা অর্থনীতি নিয়ে পড়া। এরপর প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিতে চায়। বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছাও আছে তার। তবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে চিন্তায় আছে সে। স্মরণিকা বলে, ‘আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো না। এ অবস্থায় আমার জন্য স্বপ্ন দেখাও অনেকটা স্বপ্নের মতো অবাস্তব। জানি না কত দূর এগোতে পারব।’

মা কনিকা শিকদার বলেন, খলিলপুর বাজারের ছোট মুদিদোকানটিই তাঁদের একমাত্র আয়ের উৎস। এই আয় দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। এর মধ্যে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সামনে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ আরও বাড়বে।

খলিলপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান শেখ বলেন, স্মরণিকা অত্যন্ত মেধাবী। পরিবারটি খুবই দরিদ্র। একটু সহযোগিতা পেলে তার স্বপ্নপূরণের পথ খুলে যেতে পারে।

শত অভাবেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে অষ্টমী

অষ্টমী রানী দাস

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অজপাড়া গ্রাম বারেঙ্গাকান্দা। সেই গ্রামে অষ্টমীদের বাস। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা অষ্টমী নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে পড়িয়েছে। বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে গেছে। ভালো পোশাক তো দূরের কথা, অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জোটেনি। দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

অষ্টমী রানী দাস নালিতাবাড়ীর উত্তর নাকশী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। তার এই সাফল্যে বাবা উপেন্দ্র চন্দ্র দাস ও মা দরদী রানী দাস আনন্দিত। তবে মেয়ের কলেজে পড়ানোর খরচ কীভাবে জোগাবেন, তা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।

চার বোনের মধ্যে অষ্টমী সবার ছোট। বাবা উপেন্দ্র চন্দ্র দাস পেশায় জেলে। সারা দিন মাছ ধরে বিক্রি করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। এর মধ্যে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ধারদেনা ও অন্যের সহযোগিতা নিয়ে।

অসুস্থতার কারণে এখন আগের মতো নিয়মিত মাছ ধরতে পারেন না উপেন্দ্র। এক দিন মাছ ধরতে গেলে পরের দুই দিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। এ ছাড়া আগের মতো জলাশয়ে মাছও পাওয়া যায় না। ফলে সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

অষ্টমীর মা দরদী রানী বলেন, ‘এখনো দেড় লাখ টাকা ঋণ আছে। ছোট মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ। শত অভাবের মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। ভালো ফল করেছে, আমরা খুশি। কিন্তু এখন মেয়ের পড়াশোনা চালাব কী দিয়ে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

উত্তর নাকশী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, অভাব-কষ্ট পরিবারটির নিত্যসঙ্গী। তবু অষ্টমী থেমে যায়নি। শিক্ষকেরা তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। সে সেই চেষ্টা কাজে লাগিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে। মেয়েটি মেধাবী। সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষায় ভালো করবে।

অষ্টমীর স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে একজন মানবিক চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবা করতে চায় সে।

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন সালমার

সালমা আক্তার

সফর আলী ছিলেন পেশায় দিনমজুর। ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। কিছুদিন পরই দুই বছর বয়সী মেয়ে সালমা আক্তারকে নিয়ে মা মমতাজ বেগম স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। শিশু মেয়ের ভরণপোষণ ও দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাতে লেগে যান বাসাবাড়ি ও হোটেলে রান্নাবান্নার কাজে। কষ্ট থাকলেও হৃদয়ের কোণে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন, মেয়ে লেখাপড়া করে সংসারের অভাব ঘোচাবে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়ে সালমা দেখিয়ে দিয়েছে, মায়ের স্বপ্নপূরণের পথেই হাঁটছে সে।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সালমা। তার বাবার বাড়ি ছাতক উপজেলার রাজগাঁও গ্রামে হলেও ১৫ বছর ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে জেলার মধ্যনগর উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকার সময় একবার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় সালমার। এক শিক্ষকের সহায়তায় আবার পড়ালেখা শুরু হয়। পরে স্কুলের শিক্ষকদের অনেক সহায়তা পেয়েছে। বিনা বেতনে পড়াশোনা করেছে। এসএসসির ফরম পূরণে টাকাও দিতে হয়নি।

বাবার চেহারা মনে নেই উল্লেখ করে সালমা আক্তার বলে, ‘আমার মা আমার কাছে মা ও বাবা দুটোই। আমি লেখাপড়া করে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হতে চাই। কিন্তু আমাদের যা অবস্থা, যদি কোনো সহায়তা না পাই তাহলে আমার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে।’

মা মমতাজ বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামীর কুনু সম্পদ ছিল না। মেয়ের স্বপ্ন হে লেহাপড়া কইরা বড় অফিসার অইব? আমি বাসাবাড়ি ও হোটেলও রান্নাবান্নার কাম কইরা দৈনিক ২০০ টাকা মজুরি ফাই। মাইয়ারে কলেজে ভর্তি কইরা লেহাপড়ার খরচ দিয়াম, হেই সামর্থ্য আমার নাই।’

মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ বিজন কুমার তালুকদার বলেন, সালমা অত্যন্ত মেধাবী। লেখাপড়া করার প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে সে ভালা কিছু করবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও ভৈরব; প্রতিনিধি, শেরপুর ও ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ]