
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করেছেন শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগ এবং ক্লাস বর্জনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
গতকাল বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে আলোচনা শেষে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ কথা জানান।
এর আগে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান এলাকা থেকে সহস্রাধিক নারী শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলে সংহতি জানিয়ে ছাত্ররাও অংশ নেন। মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা প্রথমে প্রক্টর কার্যালয়ে ও পরে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেন।
আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তার ও প্রশাসনের নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন সহস্রাধিক নারী শিক্ষার্থী। মিছিলটি কয়েকটি সড়ক ঘুরে প্রথমে প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় ধর্ষকের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন তাঁরা। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেন। প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে ঘোষিত দফাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—আসামিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার, দায় স্বীকার করে প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল টিমকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ উপাচার্যেরও পদত্যাগের দাবি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে পাঁচ দফা ঘোষণার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই সব দাবির সঙ্গে একমত নন বলে জানান। এ ছাড়া একটি নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এক তরফা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এমন অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাঁরা দুটি পক্ষ হয়ে আন্দোলন করতে থাকেন। এরপর দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। প্রশাসনিক ভবনের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুটি পক্ষ হয়।
একদিকে ছিল ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রফ্রন্টের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়ন, ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের ব্যানারে রাজনীতি করা সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ। দীর্ঘক্ষণ দুই পক্ষ আলাদা করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। এরপর আন্দোলনকারী দুই পক্ষের মধ্য থেকে কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রশাসনিক ভবনে আলোচনায় বসেন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। ওই আলোচনায় উপস্থিত নারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কাছে ছয় দফা দাবি জানান। দাবিগুলো উপাচার্য পূরণের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা রাত সাড়ে তিনটার দিকে হলে ফিরে যান।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে প্রথম দাবি: অপরাধীকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে। যদি প্রথম দাবিটি পূরণ না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল দলের সদস্যদের পদত্যাগ করতে হবে, হেনস্তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, কুইক রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে এবং প্রক্টরিয়াল টিমের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাদের সার্বক্ষণিক সক্রিয়তা নিশ্চিত করতে হবে, সক্রিয় কার্যকরী হটলাইন ইমারজেন্সি হটলাইন চালু করতে হবে, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, প্রতিটি গেটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরী মোতায়েন এবং সাত দিনের মধ্যে কাঠামোগত ত্রুটি মেরামত করতে হবে, ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের কুইক রেসপন্স টিমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ বিষয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাযিহা নাওয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সুস্পষ্ট ছয় দফা দাবি উপাচার্যের কাছে লিখিত দেওয়া হয়েছে। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন দাবিগুলো বাস্তবায়নের। যদি আমাদের দাবি পূরণ না হয়, তাহলে আবার কর্মসূচিতে যাব এবং আগামী রোববার থেকে ক্লাস–পরীক্ষা বর্জন করব।’
গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলতুন্নেছা হলসংলগ্ন রাস্তা থেকে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকার স্থানে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন এক ব্যক্তি। পরে গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতপরিচয় একজনকে আসামি করে মামলা করে।