প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দারোগারখাল এলাকায় পরিষদ চত্বরে রাজাপুর ও আশপাশের ২৫০ মানুষের মধ্যে কম্বল দেওয়া হয়। রোববার সকালে
প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দারোগারখাল এলাকায় পরিষদ চত্বরে রাজাপুর ও আশপাশের ২৫০ মানুষের মধ্যে কম্বল দেওয়া হয়। রোববার সকালে

প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগ

ভোলায় শীতে কাবু জামেলা খাতুনদের মধ্যে কম্বল বিতরণ

ভোলার ইলিশা নদীর তীরে কুঁড়েঘরে পাতলা প্লাস্টিকের ছাউনি, হোগলা পাতার বেড়া আর নিচে মাটির ভিটি—এই নিয়েই এ বছর শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেছেন বিধবা জামেলা খাতুন (৬৪)। কয়েক দিন ধরে হাড়কাঁপানো শীতে তাঁর বৃদ্ধ শরীর কেঁপে উঠেছে বারবার। সঙ্গে কষ্টে আছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে তাছনুর বেগম (৩৫)। তাঁদের বসতঘর ভোলার উত্তরে সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে।

আজ রোববার প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে কম্বল পেয়ে জামেলা খাতুন বলেন, ‘পুরা শীতে কষ্টে রাইত কাটছে। শীতের এ বেলায় আইজ মায়–ছায় মিল্লা নতুন কম্বলের নিচে রাইত কাডামু।’

প্রায় ৩০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর খেয়ে না–খেয়ে চার ছেলে–মেয়েকে বড় করেছেন জামেলা খাতুন। এখন ছেলেরা বিয়ে করে ঢাকায় যে যাঁর মতো কাজ করেন, সেখানেই থাকেন। আর জামেলা পড়ে আছেন নদীর পাড়েই। চেয়েচিন্তে চলে তাঁর সংসার।

ঢাকা ব্যাংকের সহযোগিতায় প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে ভোলা প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা জেলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়ন ও আশপাশের ২৫০ অসহায়, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের বৃদ্ধদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করেন।

‘নদীর তীরে বাস, ভাবনা বারো মাস’—এই প্রবাদ যেন শতভাগ মিলে যায় ইলিশা নদীর পাড়ের মানুষের জীবনে। রাজাপুর ইউনিয়নের কন্দর্পপুর গ্রামের আবদুল মালেক (৬৪) অনেক কষ্টে অস্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্ষায় উচ্চ জোয়ার আর জলোচ্ছ্বাসে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। তখন বাধ্য হয়ে পলিথিন ও গাছপালা দিয়ে কোনোরকমে ঘরের ভিটি ঠেকান। আর শীত মৌসুম এলে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ, হাড় কামড়ানো ঠান্ডার সঙ্গে। এবার তিনি কোনো শীতবস্ত্র পাননি। নতুন কম্বল পাওয়ায় তিনি খুশি। রাতে গায়ে দিয়ে ঘুমাবেন বলে জানান।

পুরোনো দিনের কাঁথা ও ছেঁড়া কম্বল গায়ে দিয়েই রাত কাটাতে হয় কন্দর্পপুর গ্রামের আবদুল মান্নানকে (৭০)। শেষ রাতে সেই কাঁথা–কম্বলও ঠান্ডা হয়ে যায়। শীতে হাত–পায়ের হাড় কামড়ে ধরে। তখন সহ্য করতে না পেরে কখনো চুলার পাশে বসেন, কখনো শুকনা পাতা জ্বালিয়ে আগুন পোহান। প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল পেয়ে আবদুল মান্নান বলেন, ‘জীবনে কেউ একটা কম্বল দেয় নো। আমনেরাই পরথোম দিলেন, আল্লায় আমনেগো বাঁচাইয়া রাহুক!’

গতকাল শনিবার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজাপুর, কন্দর্পপুর ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার দরিদ্র ও অসহায় বৃদ্ধদের বাড়ি গিয়ে কার্ড বিতরণ করা হয়। বন্ধুসভার সদস্যরা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে শীতার্ত এই মানুষের মধ্যে কার্ড বিতরণ করেন।

আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে জড়ো হন শীতার্ত মানুষেরা। লাঠিতে ভর করেও আসেন কয়েকজন বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী। দুপুর ১২টার দিকে নারী–পুরুষকে পৃথকভাবে লাইনে দাঁড় করিয়ে কম্বল বিতরণ করা হয়ে। বন্ধুসভার সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা বৃদ্ধদের পরম আদরে কম্বল গায়ে পরিয়ে দিয়েছেন।

কম্বল বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হোসেন মাহমুদ চৌধুরী, রাজাপুর ল্যাবরেটরি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমির হোসেন, স্থানীয় সমাজসেবক মো. জামাল হোসেন, মো. ফজলে রাব্বী, প্রথম আলোর ভোলা জেলা প্রতিনিধি নেয়ামতউল্যাহ, প্রথম আলো ভোলা বন্ধুসভার সভাপতি সুমন ওয়াহিদ, সাধারণ সম্পাদক নাইমুর রহমান সম্রাট, সহসভাপতি অন্তর হাওলাদার, সাবেক সভাপতি মো. আশরাফুল প্রমুখ।

ক্রাচে ভর দিয়ে কম্বল নিতে এসেছিলেন দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের মো. শাজাহান (৭৬), মাসুদা খাতুন (৬৫), ইদ্রিস আলী রাঢ়িসহ (১০৭) অনেকে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা অনেক গরিব ও অসহায়। দারিদ্র্যসীমার নিচে তাঁদের জীবনযাপন। সামর্থ্য না থাকায় নদীর পাড়েই ঝুঁকি নিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। বর্ষায় যেমন উত্তরের ঢল নদীতীরে আঘাত হানে, তেমনি শীতে উত্তুরে হাওয়া কাঁপিয়ে দিয়ে যায় বৃদ্ধ মানুষদের।

শীতার্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারেন আপনিও। সহায়তা পাঠানো যাবে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে। হিসাবের নাম: প্রথম আলো ট্রাস্ট/ত্রাণ তহবিল, হিসাব নম্বর: ২০৭ ২০০০০ ১১১৯৪, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, কারওয়ান বাজার শাখা, ঢাকা। পাশাপাশি বিকাশে সহায়তার অর্থ পাঠাতে পারেন: ০১৭১৩০৬৭৫৭৬ এই মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বরে। এ ছাড়া বিকাশ অ্যাপে ডোনেশন অপশনের মাধ্যমেও অনুদান পাঠাতে পারেন।