দিনাজপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাদিক রিয়াজ (বাঁ থেকে), জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম আফজালুল আনাম, জাতীয় পার্টির জুলফিকার হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আ ন ম বজলুর রশীদ
দিনাজপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাদিক রিয়াজ (বাঁ থেকে), জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম আফজালুল আনাম, জাতীয় পার্টির জুলফিকার হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আ ন ম বজলুর রশীদ

দিনাজপুর-২ আসন

আটজন প্রার্থী থাকলেও চতুর্মুখী লড়াইয়ের কথা বলছেন ভোটাররা

‘হামার এইঠেনা মার্কা দেখি নাহায় লোক (প্রার্থী) দেখি ভোট দিবি। মানুষের বিপদে-আপদে যাহে কাছোত আছোলো, পাশোত খাঁড়াইছে, যার বাড়ি গটগট (সহজভাবে) করি যাওয়া যাবি, চেন ধরি নেতার গোরোত যাবা হবে নায়, এমন লোক (প্রার্থী) বাছি নিমো এইবার। এইঠেনা খাঁড়াইছে আটজন কিন্তুক কনঠেস (প্রতিদ্বন্দ্বিতা) হবি চারজনের। তাও খুব বেশি কনঠেস হবা নাহায়।’

কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনের ভোটার মোসাদ্দেক হোসেন। সোমবার বিকেলে বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর বাজারে চায়ের দোকানে ভোটের বিষয়ে জানতে চাইলে এভাবেই বলেন তিনি। মোসাদ্দেকের কথা শেষ হতেই আবদুল কাদের নামের একজন বলে উঠলেন, ‘অনেক বছর তো ভোট দি নাই। এইবার মানুষের মধ্যে আনন্দ আছে, ভোটটা সে যাকে দেউক, ভোট দিতে যাবে সবাই। এইবার তো পোস্টারও নাই, তারপরও মানুষের মধ্যে উৎসাহ আছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুরে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। শহরে-গ্রামে, হাট-বাজারে গণসংযোগ করছেন। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। রাস্তাঘাট সংস্কার, কৃষিকে আধুনিকীকরণ করাসহ এলাকার বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের আশ্বাসও দিচ্ছেন। প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন নারীরাও। ১০ থেকে ১২ জন দল বেঁধে বাড়িতে বাড়িতে ঘুরছেন, ভোটারদের মাঝে লিফলেট বিতরণ করছেন।

দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট আটজন প্রার্থী। তাঁরা হলেন, বিএনপির প্রার্থী সাদিক রিয়াজ, জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম আফজালুল আনাম, জাতীয় পার্টির জুলফিকার হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেদওয়ানুল কারীম রাবিদ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মোকাররম হোসেন। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আনোয়ার চৌধুরী ও বিএনপির জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আ ন ম বজলুর রশীদ (বর্তমানে বহিষ্কৃত)।

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আসনটিতে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৮ জন। এর মধ্যে বিরলে ২ লাখ ৩০ হাজার ৫৬৫ জন এবং বোচাগঞ্জে ১ লাখ ৪০ হাজার ৯১৩ জন।

গত দুই দিনে বোচাগঞ্জের সুলতানপুর, আটগাঁও, বিরলের মঙ্গলপুর, বোর্ডহাট, বানিয়াপাড়া, বিজোড়া এলাকায় অন্তত ৩০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। ভোটাররা বলছেন, প্রার্থী আটজন হলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এ কে এম আফজালুল আনাম (দাঁড়িপাল্লা), সাদিক রিয়াজ (ধানের শীষ), জুলফিকার হোসেন (লাঙ্গল) ও বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত ‘মোটরসাইকেল’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আ ন ম বজলুর রশিদের মধ্যে।

আসনটিতে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন চারজন। দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পরে অপর তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে ওই তিন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সমর্থকেরা মশাল জ্বালিয়ে, কাফনের কাপড় পরে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছিলেন। সবশেষ দল থেকে বহিষ্কার হয়েও বিদ্রোহী হয়ে ভোটের লড়াইয়ে আছেন তিনজনের একজন। এ অবস্থায় আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন, এমনটিই বলছেন অনেক ভোটার। সব মিলিয়ে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে এবার স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বেশ আলোচিত আসন দিনাজপুর-২।

বোচাগঞ্জ উপজেলার বকুলতলা এলাকার বাসিন্দা ফরিদুল ইসলাম বলেন, জামায়াত এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর বাড়ি বিরলে। সেখানে এই দুজনসহ বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগ হবে। আর বোচাগঞ্জের ভোটটা ভাগ হবে চার ভাগে। সুতরাং বোচাগঞ্জে ভোটার কম হলেও চূড়ান্ত জয়ের ক্ষেত্রে বোচাগঞ্জের ভূমিকাই মুখ্য থাকবে।

রেজা ইসলাম নামের একজন ভোটার বলেন, ‘আসনটিতে সংখ্যালঘু ভোটার সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। আবার আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটাররাও আছেন। এখানে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটারদের ভোট যে বেশি টানবে জয় তারই হবে।’

আসনটিতে তুমুল আলোচনায় থাকা চারজনের মধ্যে বিএনপি মনোনীত সাদিক রিয়াজ একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছিলেন ৪৮ হাজার ৮২২। বাকি তিনজন এবারই প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়ের রেকর্ড আছে তিনজনেরই।

ভোটাররা যখন প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নিয়ে নানা আলোচনায় ব্যস্ত সেই সময় জয়ের ব্যাপারে নিজেদের আত্মবিশ্বাসের কথা বলছেন চার প্রার্থীই। পাশাপাশি সুষ্ঠু ভোট হওয়া নিয়ে আশঙ্কাসহ পরস্পরবিরোধী তির্যক মন্তব্যও করছেন তাঁরা।

বিএনপি মনোনীত সাদিক রিয়াজ বলেন, ‘মানুষের কাছে যাচ্ছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। একটি দল নারী কর্মীদের মাধ্যমে ভোটারদের টাকা দিচ্ছে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঁয়তারা করছে।’ নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলের মার্কা ধানের শীষ। বিদ্রোহী হতেই পারে। কিন্তু তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু ভোটাররা সেটাও বিবেচনা করবেন।’

জামায়াত প্রার্থী এ কে এম আফজালুল আনাম বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিরোধিতা করে ইসলামের নামে নানা কুৎসা রটনা করছে। কিন্তু মানুষ এগুলো আর খায় না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে সর্বোচ্চ ভোটে জয় পাব ইনশা আল্লাহ। যে জিতবে তারই আনুগত্য করব।’

বিএনপি বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আ ন ম বজলুর রশিদ নিজেকে জনগণের প্রার্থী উল্লেখ করে বলেন, ‘দল আমাকে মূল্যায়ন করেনি কিন্তু জনগণ আমাকে বুকে টেনে নিয়েছে। আজকে জনগণের মনোনীত প্রার্থীর জোয়ার দেখে অন্য প্রার্থীরা আতঙ্কিত। তাদের পায়ের তলায় মাটি সরে গেছে দেখে আমার নেতা-কর্মীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আমার বিশ্বাস, জয়ী হতে পারলে দল আমার বহিষ্কারাদেশ তুলে নেবে।’

জাতীয় পার্টির প্রার্থী জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারলে নির্বাচনে জয়ের দেখা পাব। উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলাম। জনগণ অনেক আগে থেকেই আমার সঙ্গে আছে। তবে প্রশাসনকে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’