চট্টগ্রামের দুই নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকী উপলক্ষে বিজয় মেলা চলছে। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। জুলাই আন্দোলন নিয়ে মেলা হওয়ার কথা থাকলেও পুরোপুরি বাণিজ্যিক আবহে চলছে এই মেলা। আজ বিকেল সাড়ে চারটায়
চট্টগ্রামের দুই নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকী উপলক্ষে বিজয় মেলা চলছে। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। জুলাই আন্দোলন নিয়ে মেলা হওয়ার কথা থাকলেও পুরোপুরি বাণিজ্যিক আবহে চলছে এই মেলা। আজ বিকেল সাড়ে চারটায়

জুলাই বিজয় মেলায় গয়না-কাপড়ের দোকান, এক কোণে শহীদদের ছবি

টিন আর ত্রিপল দিয়ে ঘেরা উদ্যান। বাইরে টানানো হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরামদের ছবি। প্রবেশ ফটকে লেখা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘নতুন বিজয় মেলা’। তবে ভেতরের ঢুকতেই দেখা গেল বাণিজ্যিক মেলার আবহ। পুরো উদ্যানজুড়েই জুতা, কাপড়, ব্যাগ—এসবের দোকান। এক কোণে ছোট্ট একটি স্থানে ঠাঁই হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছবি। আজ সোমবার বিকেলে চট্টগ্রামের বিপ্লব উদ্যানে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেল।

সবুজে ঘেরা উদ্যানটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে বিজয় মেলা শুরু হয় ৮ আগস্ট। ‘ছাত্রসমাজ চট্টগ্রাম মহানগর’ এর ব্যানারে আয়োজন করা হচ্ছে ১৫ দিনব্যাপী এ মেলার। এর আয়োজক নগর যুবদল নেতা আলিফ উদ্দিন ও তাঁর অনুসারীরা। তিনি নগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভেঙে দেওয়ার পর নগর যুবদলের নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি।

১৯৭৯ সালে ব্যস্ততম ২ নম্বর গেটে গাছগাছালিতে ভরা দুই একর জায়গায় বিপ্লব উদ্যান গড়ে তোলা হয়। এরপর নানা সময়ে এটিতে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। মেলার আয়োজকদের দাবি, সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে জায়গা ব্যবহারে অনুমতি নিয়েছেন। মেলার অনুমতি নিয়েছে পুলিশের কাছ থেকেও। এদিকে উদ্যানে এভাবে মেলার অনুমতি দেওয়ার সমালোচনা করে এই উদ্যোগ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।

এসব তোয়াক্কা না করে মেলার আয়োজন পুরোদমে চলছে। এ নিয়ে প্রথম আলোর অনলাইন ও ছাপা কাগজে ‘চট্টগ্রামে উদ্যানে যুবদল নেতার বিজয় মেলা, অনুমতি দিল সিটি করপোরেশন’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সে সময় সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেছিলেন, জুলাই-আগস্টের ছবি প্রদর্শন করবে বলায় অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর মাঠে এক মাস পর কাজ শুরু হবে। এখন ফাঁকা, তাই দুই সপ্তাহের মেলা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মেলায় পাটপণ্য ও কার্পেটের একটি দোকান। আজ আজ বিকেল সাড়ে চারটায় চট্টগ্রামের দুই নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানে

এক কোণে শহীদদের ছবি

মেয়র এবং আয়োজকদের বক্তব্য ছিল, মেলায় জুলাই শহীদদের ছবি প্রদর্শন করা হবে এবং মাঝে মানুষের জন্য বিনোদনের কিছু রাইড রাখা হবে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান হওয়ার কথা মেলার মূল বিষয়। তবে বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। পুরো মেলা ঘুরে এই প্রদর্শনী খুঁজে পাওয়া গেল মেলায় প্রবেশের আরেক গেটের পাশে ছোট্ট এক কোণে। এর সামনে চানাচুর-বিস্কুটের দোকান। সামনে বিক্রি হচ্ছে কার্পেট।

মেলায় প্রবেশের তিনটি পথ পাওয়া গেল। পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পাশ দিয়ে মেলায় ঢুকে প্রথমে দেখা গেল বাঁ পাশে চলছে একটি খেলনার দোকানের কাজ, ডান পাশে নারীদের গয়নার দোকান। মাঠের মাঝখানে শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও বিভিন্ন রাইড। পুরো মাঠের চিত্র একই। ৩৬টি দোকানের ৩৫টিই বাণিজ্যিক।

২ নম্বর মোড়ের পাশ দিয়ে উদ্যানের প্রবেশের পথে পাওয়া গেল জুলাই শহীদদের ছবি। একটি চানাচুর-বিস্কুটের দোকানের পাশ দিয়ে পেছনের দিকে যেতে দেখা মিলল প্রদর্শনীর। ওপরে লেখা হয়েছে ৩৬ জুলাই প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী। আনুমানিক ৫ ফুট প্রস্থ ও ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের ছোট কোণে স্থান দেওয়া হয়েছে জুলাই শহীদদের ছবি।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহ্বায়ক (চট্টগ্রাম নগর) ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জুলাইকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্যিক মেলা আয়োজন করা হচ্ছে। আমরা ডিসি ও মেয়রকে অনুরোধ করেছি জুলাইকে এভাবে বিক্রি না করতে।’

জুলাই মেলায় পণ্যের পরসা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। আজ আজ বিকেল সাড়ে চারটায় চট্টগ্রামের দুই নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানে

মেয়রকে ডিসির চিঠি

মেলার আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাঁরা মেলার অনুমতি নিয়েছেন সিটি করপোরেশন ও নগর পুলিশের কাছ থেকে। তবে নিয়ম অনুযায়ী মেলার অনুমতি দিয়ে থাকেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অর্থাৎ জেলা প্রশাসক (ডিসি)। জেলা প্রশাসক সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে মেলা বন্ধ রাখতে সিটি মেয়রকে সিটি দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। মেলার প্রাঙ্গণ ঘুরে গেছেন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সরাসরি উচ্ছেদের নির্দেশ পাইনি। তবে মৌখিকভাবে মেলার কাজ বন্ধ রাখার কথা বলে এসেছি। উচ্ছেদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলেও আজ হয়নি। জেলা প্রশাসকের নির্দেশের অপেক্ষা করা হচ্ছে। জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের চিঠির পর মেলা বন্ধ না করতে অনুরোধ করেছেন সিটি মেয়র।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেলার অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। আমরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়েছিলাম। তবে এখনো মেলা পুরোপুরি শুরু হয়নি। আমরা এক দিন পর্যবেক্ষণ করব। জুলাই চেতনাবিরোধী কিছু দেখলে উচ্ছেদ করা হবে।’

জানতে চাইলে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে মেলা ৭ দিন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে বলা আছে, বেআইনি কিছু ঘটলে মেলা বন্ধ করে দিতে।’