মাউন্ট মাকালুর চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা হাতে বাবর আলী
মাউন্ট মাকালুর চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা হাতে বাবর আলী

মাউন্ট মাকালুর অভিযান

‘আমি তখন ৭ হাজার মিটার ওপরে, বাতাস বইছিল দ্রুত, হাড় জমিয়ে দিচ্ছিল ঠান্ডা’

‘পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর উচ্চতা ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার। তবে পর্বতের সবচেয়ে কঠিন অংশটি হলো ৬ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার মধ্যবর্তী পথ। এই বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল জীবন ঝুঁকির। আমি তখন ৭ হাজার মিটার ওপরে। বাতাস বইছিল দ্রুতগতিতে, হাড় জমিয়ে দিচ্ছিল ঠান্ডা।’

মাউন্ট মাকালু অভিযান শেষে গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন করে বাবর আলী এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। তারা বাবর আলী অভিযানের আয়োজক ছিল।

মাউন্ট মাকালুর চূড়ায় ওঠার পথে পর্বতারোহীরা।

সংবাদ সম্মেলন শেষে বাবর আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘২ মে আমি পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাই। সেদিনই বেজক্যাম্পে ফিরে আসি। কিন্তু এর আট দিন পর, ১০ মে, ওই একই ৬ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার ৬০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমার আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেন তুষারধসে প্রাণ হারান। এই পথ এতই ঝুঁকিপূর্ণ যে সব পর্বতারোহীই দুশ্চিন্তায় থাকেন।’

২ মে আমি পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাই। সেদিনই বেজক্যাম্পে ফিরে আসি। কিন্তু এর আট দিন পর, ১০ মে, ওই একই ৬ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার ৬০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমার আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেন তুষারধসে প্রাণ হারান।
বাবর আলী, মাউন্ট মাকালু জয়ী

স্মৃতিচারণা করে বাবর আলী বলেন, ‘শেলির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল মাকালু বেজক্যাম্পের উদ্দেশ্যে ট্রেক করার সময়। ইয়াংলে খারকা নামের একটি স্থানে আমরা প্রথম সাক্ষাৎ করি। এরপর মাকালু হায়ার বেজক্যাম্প পর্যন্ত আমরা চার দিন একসঙ্গে ট্রেক করেছি। বেজক্যাম্পে আমাদের নিয়মিত দেখা হতো। আমরা অনেক গল্প করেছি। পর্বতারোহণ নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছি। কিন্তু শেলি আর ফিরতে পারলেন না।’

বিপজ্জনক পথ পাড়ি।

পৃথিবীতে আট হাজার মিটার বা তার চেয়ে বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে ১৪টি। বাবর আলী এখন পর্যন্ত পাঁচটির চূড়ায় উঠেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সভাপতি ফরহান জামান, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ভিজ্যুয়াল নিটওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল, সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেডের ব্র্যান্ড ম্যানেজার ইমতিয়াজ ইবনে ইমাম প্রমুখ।

বেস ক্যাম্পে অন্য সঙ্গীদের সঙ্গে বাবর আলী।

ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সভাপতি ফরহান জামান বলেন, ‘মাকালুতে বাবর আলীর সৌজন্যে লাল-সবুজ পতাকা উড়েছে। এটি আমাদের জাতির জন্য গর্বের বিষয়।’

বরফে ঢাকা পথ পাড়ি দিয়ে চলেন পর্বতারোহীরা।

সংবাদ সম্মেলনে বাবর আলী বলেন, ‘মাকালুতে প্রতিটি মুহূর্তই যুদ্ধের মতো। প্রচণ্ড ঠান্ডা আর হাড় হিম করা বাতাসে কাটানো প্রতিটা মিনিটই ঝুঁকিপূর্ণ। সঙ্গে ছিল তুষারধসের ভয়। আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছিল, তাই মানিয়ে নেওয়া খুব কঠিন ছিল।’

মাকালু যাওয়ার পথে তাশিগাঁও গ্রামে বাদ্যযন্ত্র হাতে বাবর আলী।

চূড়া আরোহণের উদ্দেশ্যে বাবর আলী ৭ এপ্রিল দেশে ছাড়েন। ৯ এপ্রিল বিমানযোগে পৌঁছান নেপালের টুমলিংটার। সেখান থেকে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে যান। ১৭ এপ্রিল হেঁটে পৌঁছান পর্বতের উচ্চতর বেজক্যাম্পে। এরপর উচ্চতার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ এবং ২২ এপ্রিল ক্যাম্প-২ তে বিশ্রাম নিয়ে ৭ হাজার মিটার উচ্চতা ছুঁয়েছেন। পরে আবার বেজক্যাম্পে ফিরে আসেন।

মাকালু যাওয়ার পথে চোখ জুড়াবে এমন দৃশ্য।

দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল ক্যাম্প-২ তে এক দিন কাটিয়ে পরের দিন আবার বেজক্যাম্পে আসেন। এরপর শুরু হয় ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা। আবহাওয়া কিছুটা সদয় হওয়ার আভাস পেয়ে ৩০ এপ্রিল আবার শুরু করেন চূড়ায় চড়া। ওই দিন সরাসরি ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২–এ পৌঁছান এবং পরদিন ওঠেন ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩ তে। বিকেলটা সেখানে অপেক্ষা করে মাঝরাতে বের হন শিখরের উদ্দেশ্যে। একটানা ১ হাজার ১০০ মিটার বা তারও বেশি পথ অতিক্রম করে ভোরে পৌঁছান শিখরে। আরোহণ শেষে সেদিনই লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে বেজক্যাম্পে ফিরে আসেন।

বাবর আলী বলেন, ‘এই অভিযানের প্রতিটি ধাপই চ্যালেঞ্জিং ছিল। প্রতিটি চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা হাতে দাঁড়ানো দেশের জন্য গর্বের।’