
‘আজকে রাতের পর চলে যাব। আমি আর এখানে থাকব না, আমাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে চলো।’ গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছোট বোনের প্রতি এই আকুতি ছিল ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অর্পিতা দাশের (২৬)। তবে জীবিত অবস্থায় আর বাসায় ফিরতে পারেননি তিনি। পরদিন শুক্রবার দুপুরে আইসিইউতেই মৃত্যু হয় অর্পিতার। তাঁর গর্ভে থাকা সন্তানটিরও মৃত্যু হয়।
অর্পিতা দাশের বাবার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বৈলতলী গ্রামে। তবে তাঁর মায়ের বাসা নগরের পাথরঘাটার আশরাফ আলী সড়কে। ২০১৮ সালে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তাঁর বাবা। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন সাবেক স্কুলশিক্ষিকা মা দীপালি দাশ।
বিয়ের পর অর্পিতা স্বামী মিথুন চৌধুরীর সঙ্গে থাকতেন নগরের চন্দনপুরা এলাকায়। ঘরে নতুন অতিথি আসবে—এই আনন্দে দুই পরিবার মিলে সম্প্রতি নগরের ফিরিঙ্গিবাজারে নতুন একটি বাসা ভাড়া নেয়। নতুন সংসার গোছানোর প্রস্তুতি চলছিল। অনাগত সন্তানকে ঘিরে চলছিল নানা আয়োজন। তবে বাসাটি পুরোপুরি গোছানোর আগেই চলে যেতে হলো অর্পিতাকে।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা অবস্থায় অর্পিতাকে দেখতে যান তাঁর ছোট বোন। তখন শরীরে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছেন বলে তাঁকে জানান অর্পিতা। হাসপাতালে আর থাকতে চাইছিলেন না তিনি। বারবার বলছিলেন, তাঁকে যেন বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
অর্পিতার পিসিশাশুড়ি শিউলি চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্পিতা। প্রথমে হালকা জ্বর ছিল। পরদিন সকালে জ্বর বেড়ে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট হয়। রাতে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ ডিগ্রিতে। পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানো হলে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ওই রাতেই তাঁকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে মেমন মাতৃসদন হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখান থেকেও অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় তাঁদের।
শিউলি চৌধুরীর ভাষায়, এরপরই শুরু হয় ‘যুদ্ধ’। গত ৭ সেপ্টেম্বর অর্পিতাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে নেওয়া হয় এইচডিইউতে। গত বৃহস্পতিবার চিকিৎসকেরা তাঁকে এইচডিইউ থেকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তখন হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি ছিল না। তাই দুপুরে তাঁকে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং আরও অবনতি হলে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন, অর্পিতাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যেতে। দ্রুত তাঁকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয় অর্পিতাকে। ভর্তি করা হয় আইসিইউতে।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা অবস্থায় অর্পিতাকে দেখতে যান তাঁর ছোট বোন। তখন শরীরে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছেন বলে তাঁকে জানান অর্পিতা। হাসপাতালে আর থাকতে চাইছিলেন না তিনি। বারবার বলছিলেন, তাঁকে যেন বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। শিউলি চৌধুরী বলেন, ‘ও বলছিল, আজকে রাতের পর চলে যাব। আমি আর এখানে থাকব না, আমাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে চলো। মেয়েটি আর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরতে পারল না।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, শিক্ষক মাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ ছিল অর্পিতার। স্নাতকোত্তর পড়ার পাশাপাশি পাথরঘাটার একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করতেন তিনি। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরের বলুয়ার দিঘির শ্মশানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অর্পিতার মৃত্যুর মাসটি ছিল তাঁর জন্মের মাসও। ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল অর্পিতার জন্মদিন। তবে এবার জন্মদিনের চেয়ে অক্টোবর মাস নিয়েই বেশি আগ্রহ ছিল তাঁর। কারণ, ১২ অক্টোবর ছিল তাঁর প্রথম সন্তানের সম্ভাব্য জন্মতারিখ। আর ১৬ অক্টোবর প্রথম বিবাহবার্ষিকী। জন্মদিন, সন্তানের আগমন আর বিবাহবার্ষিকী—সব মিলিয়ে অক্টোবরকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা ছিল অর্পিতা ও তাঁর স্বামী মিথুন চৌধুরীর। সেই পরিকল্পনা আর পূরণ হলো না তাঁদের।
অর্পিতার মৃত্যুর এক দিন আগে, গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের একটি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রাশেদা বেগম (২৯) নামের এক স্বাস্থ্য সহকারী। তিনি সন্দ্বীপের বাসিন্দা। রাশেদার দুই সন্তান। বড় ছেলে আতেফ আমীরুলের বয়স সাড়ে চার বছর। আর ছোট ছেলে আদিয়ান আমীরুলের বয়স মাত্র এক মাস। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৯৬ জন। মারা গেছেন ১০ জন।