সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে আইনজীবীদের মানববন্ধন। আজ সোমবার সকালে জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে
সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে আইনজীবীদের মানববন্ধন। আজ সোমবার সকালে জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে

সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে আইনজীবীদের মানববন্ধন

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। একই সঙ্গে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন প্রধানের সঞ্চালনায় এ মানববন্ধনে প্রধান অতিথি ছিলেন মামলাটির বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। এ ছাড়া এতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ্ আল আমিন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ জাকির, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের পিপি খোরশেদ আলম মোল্লা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ।

সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, সাত খুনের ঘটনা পর জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন–সংগ্রাম করতে হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় অবিলম্বে কার্যকর করা হোক। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হলে যারা গুম খুন করে, আসামিপক্ষ যত শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হোক না কেন, তারা আইনের আওতায় আসবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, যাঁরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাঁদের পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। যেহেতু প্রশিক্ষিত বাহিনীর দ্বারা এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ্ আল আমিন বলেন, ‘অতীতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে গডফাদার ওসমান পরিবারের সম্পর্ক আছে। এই সাত খুন ও ত্বকী হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোয় কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে গডফাদারদের প্রতি একধরনের প্রোটেকশন ছিল। আমরা চাই, অপরাধী যে কেউ হলেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাত খুন মামলাটি আপিল বিভাগে ঝুলে আছে, বিষয়টি আশু নিষ্পত্তি হবে এবং রায় কার্যকর হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও পরদিন আরেকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল ফতুল্লা মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন। ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা—লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ, মেজর (অব্যাহতি প্রাপ্ত) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব্যাহতি প্রাপ্ত) এম এম রানা—সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

পরে আসামিপক্ষের আপিলে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট নূর হোসেন, র‍্যাবের সাবেক ৩ কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। একই সঙ্গে ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজাও বহাল রাখা হয়। মামলাটি বর্তমানে লিভ টু আপিলের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

স্বজন ও এলাকাবাসীর মানববন্ধন

সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে আজ দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধন করেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও এলাকাবাসী। তাঁরা বলেন, হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ এক যুগ পার হলেও মামলার রায় কার্যকর না হওয়ায় তাঁরা অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বলেন, ‘আমরা ১২ বছর ধরে বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। বুকভরা কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি। জীবিত অবস্থায় যেন এই হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি—এটাই দাবি।’

সেলিনা ইসলাম আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কীভাবে এমন নৃশংস ঘটনায় জড়ালেন—তা এখনো বোধগম্য নয়। মানুষ যদি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছেই নিরাপদ না থাকে, তাহলে কোথায় যাবে? আমরা এখনো নূর হোসেন ও তার লোকজনের ভয়ে-আতঙ্কে থাকি।’

নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সামছুন নাহার বলেন, ‘আমার স্বামীকে যখন হত্যা করা হয়েছে, তখন সন্তানের বয়স সাত মাস ছিল। এখন সে বড় হচ্ছে, বাবাকে খোঁজে। জীবনে সে তাঁর বাবার আদর পেল না। আমি চাই, দ্রুত রায় কার্যকর হোক। এ হত্যাকাণ্ডে শুধু সাতজন মানুষ নয়, ধ্বংস করা হয়েছে সাতটি পরিবার।’

নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে আছে। দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’