
জামালপুরে একসময়ের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র এখন প্রায় মরা নদ, এর বুকজুড়ে কেবল যেন নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার মধ্যে ভেসে আসছিল জাল ফেলার শব্দ। হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক জাল ফেলছিলেন দুদু মিয়া (৫০)। কিন্তু তাঁর জালে তেমন মাছ উঠছিল না।
কখনো দু-একটি ছোট মাছ উঠলেও বেশির ভাগ সময় খালি জালই ফিরে আসছিল দুদু মিয়ার হাতে। তবুও থামছিলেন না তিনি। কারণ, সামান্য কিছু মাছ পেলেও পরিবারের সবাই মিলে খেতে পারবেন।
রোববার সকালে জামালপুর শহরের পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় কথা হয় দুদু মিয়ার সঙ্গে। তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্পের সঙ্গে উঠে আসে ব্রহ্মপুত্র নদের অতীত ও বর্তমানের চিত্রও।
দুদু মিয়া শেরপুর সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে জামালপুর শহরের ব্রহ্মপুত্র নদসংলগ্ন বানিয়াবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। একসময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এলাকায় কাজ কমে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে শহরে চলে আসেন। এখন বালুশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তবে নিয়মিত কাজ জোটে না।
যেদিন কাজ থাকে না, সেদিন ভোরে ঝাঁকি জাল নিয়ে নদে মাছ ধরতে নামেন দুদু মিয়া। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত জাল ফেলেন তিনি। বেশি মাছ পেলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন, আর কম হলে বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু নদে আগের মতো এখন আর মাছ পাওয়া যায় না।
দুদু মিয়া বলেন, তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অর্থাভাবে ছেলের লেখাপড়া চালাতে পারেননি। সংসারে টানাপোড়েন লেগেই আছে। ছেলে এখন ভাড়ায় ইজিবাইক চালান। কিন্তু তাঁরও সংসার আছে—স্ত্রী ও একটি ছোট সন্তান।
দুদু মিয়া বলেন, ‘এই বয়সে ট্রাকে বালু ভরতে বহুত কষ্ট লাগে। কোনো উপায়ও নাই। এক দিন কাম না করলে ঘরের চুলা জ্বলবে না। সপ্তাহে তিন–চার দিন কাম জোটে। ওই টেহায় সাত দিন চলে না। বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ছে। ডাল আর শুঁটকি দিয়েই বেশি খাইতে হয়।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুম চললেও ব্রহ্মপুত্রে পানির পরিমাণ খুব কম। মাঝনদের কিছু অংশে পানি থাকলেও বেশির ভাগ অংশ প্রায় শুকিয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে নদ খননের কাজ চলছে। নদে এখনো খননযন্ত্র ভাসছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খননের পরও নদ আগের রূপে ফিরছে না। একদিকে খনন করা হচ্ছে, অন্যদিকে আবার দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় এই নদে ছিল প্রবল স্রোত। পুরোনো ফেরিঘাট এলাকা থেকে ফেরিতে দুই জেলার যানবাহন পারাপার হতো। নদে মিলত নানা প্রজাতির মাছ। নদকেন্দ্রিক জীবিকা ছিল হাজারো মানুষের। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। দিনভর জাল ফেলেও মাছ পাওয়া যায় না। ফলে অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।
নদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে দুদু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই নদ জামালপুর আর শেরপুরকে আলাদা করছে। নদের ওপরই দুই জেলার হাজারো মানুষের রুজি ছিল। আগে নদে অনেক মাছ পাওয়া যাইত। ওই মাছ বিক্রি কইরাই সংসার চলত। এখন নদে মাছ নাই। নদ থেইক্যা বালু তুলতে তুলতে শেষ কইরা ফালাইছে।’
নিজের ধরা মাছ দেখিয়ে দুদু মিয়া আরও বলেন, ‘ভোর থেইকা জাল ফেলতেছি। দেহেন, বালতির তলাও ভরে নাই। ২০–৩০ বার জাল ফেলে দু-একটা বাইলা আর পুঁটি পাইছি। আগের মতো নদে আর মাছ নাই।’
জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, এককালের প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র এখন স্রোত ও নাব্যতাহীন। বালু উত্তোলনের কারণে নদটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগে বর্ষা, শুষ্ক—সব মৌসুমেই নদে পানি ও স্রোত থাকত। এখন বর্ষাতেও সেই চিত্র নেই। এখন নদটি অনেকটা খালে পরিণত হয়েছে। অথচ একসময় এই নদকে ঘিরে হাজারো পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত।