
এক সময় ছিল টিনের চালা ও বেড়া। বর্তমানে মসজিদটি তিনতলা ভবনের। মূল ভবনের উত্তর-দক্ষিণে ১০০ ফুট ও পূর্ব-পশ্চিমে বারান্দা ছাড়া ৯২ ফুট দৈর্ঘ্য। মসজিদটিতে রয়েছে ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি উঁচু মিনার। তিনটি বড় গম্বুজ। মসজিদসংলগ্ন নদীর পাড়ে বিশ্রামের জন্য ঘাটশেড। সামনে খোলা মাঠ, সীমানাপ্রাচীর ও নরসুন্দা নদীর ওপর মনোরম সেতু।
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিমাংশে মসজিদটির সুউচ্চ মিনার বহুদূর থেকে চোখে পড়ে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বাহারি রঙের আলোয় সজ্জিত সৌন্দর্য আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় ঐতিহাসিক ‘পাগলা মসজিদের’। জনশ্রুতির কারণে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন, দেশের বাইরে থেকেও মুসলমানসহ নানা ধর্মের মানুষ তাঁদের ইচ্ছা ও মনোবাসনা পূরণের জন্য এখানে দানখয়রাত করে থাকেন।
মানুষের দানে ঐতিহাসিক এ মসজিদটি এখন দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। এই দানখয়রাতের টাকায় পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, বর্তমানে আধুনিক তুরস্কের বসফরাস প্রণালীর পাশে যে দৃষ্টিনন্দন মাল্টিপারপাস মসজিদ আছে ওইটার আদলে পাবে মসজিদটি।
তিন-চার মাস পরপর মসজিদের দান সিন্দুক খোলা হয়। এই সময়ের মধ্যেই সিন্দুকগুলোতে জমা হয় কোটি কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ দানের এই নগদ টাকা ছাড়াও বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ও দান হিসেবে প্রতিবারই বেশ কিছু স্বর্ণালংকারও পাওয়া যায়। গত ৩০ আগস্ট সর্বশেষ কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের ১৩টি সিন্দুক খুলে দিনভর গণনা করে রেকর্ড ১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মসজিদের ব্যাংক হিসাবে শতো কোটি টাকার ওপরে জমা হয়েছে বলে জানিয়েছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ।
কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মসজিদটি গড়ে ওঠে। কথিত আছে, খাস নিয়তে এ মসজিদে দান করলে মানুষের মনের আশা পূরণ হয়। সে জন্য দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে এসে দান করে থাকেন। মানুষ টাকাপয়সা ছাড়াও স্বর্ণালংকার দান করেন। এ ছাড়া গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রও মসজিদটিতে দান করা হয়।
পাগলা মসজিদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে স্বীকৃত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে। সেই জনশ্রুতির সূত্র ধরেই কিশোরগঞ্জের ইতিহাস বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নরসুন্দা নদী একদা খুবই খরস্রোতা ছিল। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, নদীর প্রবল স্রোতের মধ্যেই মাদুরে আসন করে ভেসে আছেন এক আধ্যাত্মিক সাধক। কয়েক দিনেই স্থানটিতে একটি চড়া জেগে ওঠে। অল্প দিনের মধ্যেই চারদিকে সাধকের গুণ-জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে ঘিরে আশপাশে অনেক ভক্তকুল সমবেত হন।
পরে শিষ্যরা এখানে সাধকের জন্য একটি হুজরাখানা তৈরি করেন। তাঁর মৃত্যর পর হুজরাখানার পাশেই মরদেহ সমাহিত করা হয়। হুজরাখানার স্থানটিতেই পরবর্তীকালে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। এ মসজিদটিই পরবর্তীকালে পাগলা সাধকের স্মৃতি হিসেবে ‘পাগলা মসজিদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে।
মসজিদটি নিয়ে আরও একটি জনশ্রুতিতে রয়েছে। সে অনুযায়ী, হযরতনগরের প্রতিষ্ঠাতা হযরত খানের অধস্তন তৃতীয় পুরুষ জোলকরণ খানের বিবি সাহেবা পাগলা মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বেগম সাহেবা নিঃসন্তান ছিলেন। জনসাধারণ তাঁকে ‘পাগলা বিবি’ বলে ডাকতেন। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি নরসুন্দা নদী তীরে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর নামানুসারে মসজিদটি ‘পাগলা মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। তবে এসব কেবলই জনশ্রুতি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য মসজিদের চারপাশে বিভিন্ন রকম গাছসহ রয়েছে ১০৪টি বিভিন্ন রঙের বাতি। এ ছাড়া মসজিদ-লাগোয়া রয়েছে নূরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা। এখানে ১৩০ জন এতিম শিশু পড়াশোনা করে। যাদের খাওয়াদাওয়া ও থাকার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার মসজিদের আয় থেকে বহন করা হয়। মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩৪ জন স্টাফ রয়েছেন। এ ছাড়া ১০ জন সশস্ত্র আনসার পালাক্রমে সারাক্ষণ মসজিদের পাহারায় থাকেন।
কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মসজিদটির অবস্থান। কথিত আছে, খাস নিয়তে এ মসজিদে দান করলে মানুষের মনের আশা পূরণ হয়। সে জন্য দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে এসে দান করে থাকেন। মানুষ টাকাপয়সা ছাড়াও স্বর্ণালংকার দান করেন।
মসজিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসলামিক কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে এখানে ১০ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন হবে। এখানে প্রায় ৫০ হাজার মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়সহ আলাদাভাবে পাঁচ হাজার নারী মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া এতিমদের জন্য লেখা পড়ার ব্যবস্থা, ধর্মীয় শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, একটা সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া এবং আইটি সেকশনও থাকবে। জেলা প্রশাসনের আওতায় এখানে একটি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স হবে। পাগলা মসজিদের বর্তমান আয়তন ৫ দশমিক ৫ একর। ১০ তলা বিশিষ্ট আধুনিক মাল্টিপারপাস ভবনের জন্য আরও কিছু জায়গা কেনা হবে।
পাগলা মসজিদের সব টাকা ১৩টি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে এফডিআর করে রাখা আছে। ইতিমধ্যে মসজিদ কমপ্লেক্সের জন্য নকশা জমা দিয়েছে ১২টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা করে একটি প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দিয়েছে। জেলা প্রশাসন ও মসজিদ কমিটি অতিসত্বর কার্যাদেশ দেওয়াসহ কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে।
তিন-চার মাস পরপর দান সিন্দুক খোলার দিন ঘটে এলাহিকাণ্ড। প্রথমে মসজিদের দান সিন্দুক থেকে কয়েকটি বস্তায় টাকা ভরা হয়। এরপর মেঝেতে রেখে শুরু হয় দিনব্যাপী টাকা গণনা। এতে মসজিদ ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও ব্যাংক কর্মকর্তারা ও প্রশাসনিক লোকজনসহ প্রায় পাঁচশো লোক অংশ নেন। টাকা গণনার কাজে সার্বক্ষণিক তদারকি করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পাগলা মসজিদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, পাগলা মসজিদ ও ইসলামী কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে দানের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। এ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার ওপরে নগদ ব্যাংকে জমাসহ অনলাইনের দানের আরও কয়েক লাখ টাকা জমা আছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, এছাড়া জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্তদের সহায়তাও করা হয়ে থাকে এ টাকার লভ্যাংশ থেকে।