
যমজ নবজাতক দুটির বয়স দুই সপ্তাহও হয়নি, রাখা হয়নি কোনো নামও। জন্মের ঠিক পর থেকেই তাদের দিন কাটছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। এরই মধ্যে চিকিৎসক জানিয়েছেন, বর্তমানে নিউন্যাটাল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন শিশু দুটির শরীরে প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারিয়েছে। এ খবর শোনার পর থেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন মা-বাবা।
শিশু দুটির বাবার নাম মানিক উদ্দিন (৪২)। নাটোরের লালপুর উপজেলার লক্ষ্মণবাড়িয়া গ্রামের এই বাসিন্দা পেশায় চিকিৎসক। তিনি জানান, ৫ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবে তাঁর যমজ সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মের পরপরই চিকিৎসকেরা জানান, উভয় নবজাতকের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কম। তাই তাদের হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হবে।
মানিক উদ্দিন জানান, প্রথমে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা হয় নবজাতক দুটিকে। এক দিন পর তাদের কান্নার মাত্রার বেড়ে গেলে স্থানান্তর করা হয় নিউন্যাটাল আইসিইউতে। এর পর থেকে তাদের কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিশু দুটির ‘কালচার অ্যান্ড সেনসিটিভিটি’ পরীক্ষায় দেখা যায়, উভয়ের শরীরে অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।
গতকাল দুপুরে হাসপাতালটির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দায় শুয়ে আছেন মা কোহিনুর সুলতানা। পাশে বসে আছেন মানিক উদ্দিন। তাঁদের দুই সন্তান তখন ‘মানিক-১’ ও ‘মানিক-২’ নামে আইসিইউতে। মা-বাবার মুখজুড়ে তখন কেবলই উৎকণ্ঠা।
ওই ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক মোহতারামা মোস্তারী বলেন, দুই শিশুর মধ্যে ‘মানিক-১’-এর অবস্থা তুলনামূলক ভালো। ‘মানিক-২’-এর নবজাতকের শ্বাসকষ্ট বেশি, তাই বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে। চিকিৎসকেরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন এবং দিনে কয়েকবার করে অভিভাবকদের হালনাগাদ তথ্য জানানো হচ্ছে।
মোহতারামা মোস্তারীর ভাষ্য, সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী নবজাতকের ঘটনা এর আগেও তাঁরা পেয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত একটি শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। সমস্যার আশঙ্কায় পাঁচ দিন আগেই কালচার অ্যান্ড সেনসিটিভিটি পরীক্ষার নমুনা নেওয়া হয়েছিল। রিপোর্ট আসার আগেই চিকিৎসকেরা সেই ওষুধ দেওয়া শুরু করেন। গতকাল রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তাঁদের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
কেন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সংখ্যা বাড়ছে, জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নির্বিচার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা অনুসরণ করা হয় না বা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ওষুধ খাওয়ানো হয় না। আবার দ্রুত ফল দেখানোর জন্য প্রয়োজনের চেয়ে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। ফলে কম মাত্রার ওষুধ পরে আর কাজ করে না।
বেলাল উদ্দিন আরও বলেন, এখন কালচার অ্যান্ড সেনসিটিভিটি পরীক্ষার গুরুত্ব বেড়েছে। এ পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়, কোন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর আছে আর কোনটি প্রতিরোধী হয়ে গেছে। নির্বিচার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলো টিকে থাকার কৌশল তৈরি করে ফেলে। তখন সাধারণ ওষুধ আর তাদের ধ্বংস করতে পারে না।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ল্যাবেই এ পরীক্ষা করা হচ্ছে। আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, এ শিশু দুটির তো কোনো দোষ নেই। অথচ তাদের এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে।