
তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠানের নাম বিষু। এই উৎসবে ঘিলাখেলায় মেতে ওঠেন ত্রিপুরা তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোরেরা। তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা এই খেলা বিবেচিত হয় সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে।
চাকমা প্রেমগাথা রাধামন-ধনপুদী (তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ধুনপুরী) পালায় এই ঘিলাখেলার বিবরণ পাওয়া যায়। দিগ্বিজয়ী রাজপুত্র রাধামন ও তাঁর প্রেমিকা ধনপুদী ঘিলাইখেলা খেলে অমর প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। রাধামনের ‘ঘিলা’ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ধনপুদীর শরীর বিদ্ধ করেছিল। শরীর বিদ্ধ হওয়ার বেদনা ভালোবাসার বন্ধনে আঘাত করতে পারেনি। বরং এই আঘাতে দুজনের বন্ধনের আবেগ আরও বেশি প্রগাঢ় হয়েছে।
বিষু উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ ফুল বিষুতে রাতজুড়ে ঘিলাখেলা হয়। অংশগ্রহণকারীরা সবাই যেন কিংবদন্তির রাধামন-ধনপুদীর মতো ভালোবাসার পরীক্ষায় মেতে ওঠেন। প্রতিবছর বিষু উৎসবে মহাধুমধামের সঙ্গে ঘিলাইখেলার আয়োজন হয়।
ঘিলাখেলা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের সঙ্গে চাকমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। তবে চাকমা সমাজ থেকে এখন অনেকটাই এই খেলা হারিয়ে গেছে। তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের উৎসব-পার্বণে টিকে আছে এই খেলা। বিষু উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ ফুল বিষুতে রাতজুড়ে ঘিলাখেলা হয়। অংশগ্রহণকারীরা সবাই যেন কিংবদন্তির রাধামন-ধনপুদীর মতো ভালোবাসার পরীক্ষায় মেতে ওঠেন। প্রতিবছর বিষু উৎসবে মহাধুমধামের সঙ্গে ঘিলাখেলার আয়োজন হয়। আজ সোমবার রোয়াংছড়ি উপজেলায় এই খেলার আয়োজন রয়েছে।
ঘিলাখেলা বুনো এক লতার বীজ দিয়ে খেলা হয়। বুনো ওই লতার নাম ‘গিলা’, যেটি পাহাড়ের মানুষের কাছে ‘ঘিলা’ নামে পরিচিত। রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা তাঁর ‘তঞ্চঙ্গ্যা জাতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘রাধামন-ধনপুদীর ঘিলাইখেলার প্রভাবে তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা সমাজে প্রাচীনকাল থেকে জনপ্রিয় ঐতিহ্যের খেলা হয়ে উঠেছে।’
ঘিলাখেলা একসময়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সমাজে সামাজিক সম্পর্ককে যেমন সুদৃঢ় করেছে, তেমনি বিনোদন দিয়েছে গ্রামীণ জনপদে। এখন উৎসবের খেলা হলেও সেকালে অবসরে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের নিত্যদিনের বিনোদনের মাধ্যম ছিল খেলাটি। এ জন্য ঘিলাখেলা ভালোবাসার বন্ধনের খেলা হিসেবে বিবেচিত।
উৎসবে ঘিলাখেলা বিরামহীনভাবে সারা রাত খেলা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ এই খেলায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে অত্যন্ত ধৈর্য, সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয়। সেখানেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন প্রগাঢ় হয়ে উঠে।ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আহ্বায়ক (টুর্নামেন্ট উপকমিটি), বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা।
বান্দরবানে বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা (বাতকস) আয়োজিত বিষু মেলায় ঘিলাখেলা টুর্নামেন্ট উপকমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গিলালতার পরিপক্ব ফলের বীজকে তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমারা “ঘিলা” বলেন। এটি দিয়ে খেলা হয় বলে খেলাটির নাম “ঘিলাখেলা”। উৎসবে ঘিলাইখেলা বিরামহীনভাবে সারা রাত খেলা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ এই খেলায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে অত্যন্ত ধৈর্য, সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয়। সেখানেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন প্রগাঢ় হয়ে উঠে।’
ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘খেলোয়াড়রা কয়েক প্রকারের ঘিলাখেলা খেলেন। মকখেলা, কুইচুক খেলা, গামাইত খেলা, ব্যাঙখেলা, পাইচে খেলা; এ রকম আরও কয়েক ধরনের খেলা আছে। প্রতিটি খেলায় ৩ থেকে ১১ জন করে দুই দলে খেলে থাকেন। শুধু মেয়েদের, শুধু পুরুষদের কিংবা নারী-পুরুষ একসঙ্গে নানা ক্যাটাগরিতে এই খেলা হয়।’ তিনি বলেন, ‘মাঠে একদল ঘিলা পেতে রাখেন, বিপক্ষ দল পেতে রাখা ঘিলা লক্ষ্য করে তাদের ঘিলাই ছুড়ে মারেন। বিপক্ষ দলের পাতানো সব কটি ঘিলা কুপোকাত করতে পারলে খেলার একটি ধাপ শেষ হয়ে যায়। এভাবে প্রতিটি খেলায় পাঁচ থেকে ১৩টি লক্ষ্যভেদী ধাপে প্রতিপক্ষ দলকে হারিয়ে অন্য দলটি জয়লাভ করে। প্রত্যেকটি ধাপে লক্ষ্যভেদ করে বিজয়ী হতে হলে খেলোয়াড়দের প্রত্যেককে শৃঙ্খলা, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হয়।’
এবারে বিষু উৎসবে রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরে তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে ঘিলাখেলার আয়োজন করা হয়েছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষের ৪৭টি দল এতে অংশগ্রহণ করেছে বলে সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় ঘিলাখেলার উদ্বোধন করেন বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী।