
এক নারী মুঠোফোনে প্রথমে পুরুষদের সঙ্গে গড়ে তোলেন প্রেমের সম্পর্ক। এরপর কৌশলে ডেকে নেওয়া হয় বাসায়। সেখানে জিম্মি করে বিবস্ত্র অবস্থায় ধারণ করা হয় ভিডিও, চলে ব্যাপক মারধর। এই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। সুনামগঞ্জে তিনজনের এমন ‘হানি ট্র্যাপে’ পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক ব্যবসায়ী খুইয়েছেন ছয় লাখ টাকা; আরেক ব্যবসায়ী খুইয়েছেন সোনা ও টাকাপয়সা। আর এক সরকারি কর্মচারী ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি গেছে বেশ কিছু টাকা।
ওই চক্রের এক নারী ও এক পুরুষ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা হয়েছে। এক ঘটনায় ওই দুজনকে গ্রেপ্তারের পর শহরের আরও দুই ব্যবসায়ী থানায় গিয়ে এমন ফাঁদে পড়ে তাঁদের দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। পুলিশের কাছে দিয়েছেন ভিডিওসহ তথ্য–প্রমাণ।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রতন শেখ সোমবার রাত আটটায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একটি ঘটনায় অভিযোগ পেয়ে হানি ট্র্যাপ চক্রের দুজনকে গ্রেপ্তার করি। এখন আরও দুজন ব্যবসায়ী এসে একইভাবে ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁরা ভিডিও দেখিয়েছেন। তথ্য–প্রমাণ দিয়েছেন। আমরা ওই চক্রে যুক্ত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনব।’
হানি ট্র্যাপ একধরনের অপকৌশল। বাংলা অনুবাদে একে ‘ভালোবাসার ফাঁদ’ নামে অভিহিত করা যেতে পারে। সহজ কথায় এটা হলো যৌনতার প্রলোভন দেখিয়ে বিপক্ষ শিবির থেকে তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি। যৌনতা ও শারীরিক সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে কাজ সমাধা করে নেওয়ার নামই হানি ট্র্যাপ। নিছক মজা করার জন্য এই ফাঁদ পাতা হয় না, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী বা গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই থাকে এর উদ্দেশ্য।
পুলিশ জানায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার অজিত চন্দ্র দাস (৪০) জেলা সমবায় বিভাগের কর্মচারী। তিনি নিজের মুঠোফোন দিয়ে বিভাগের আরেক কর্মচারীকে কথা বলিয়ে দেন এক নারীর (৩০) সঙ্গে। এরপর ওই নারীর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে থাকেন ভুক্তভোগী কর্মচারী। একপর্যায়ে ওই নারী তাঁকে কৌশলে শহরের একটি বাসায় ডেকে নেন। সেখানে নিয়েই তাঁকে জিম্মি করা হয়। বিবস্ত্র করে ভিডিও ও বেধড়ক মারধর করা হয়। এরপর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে দাবি করা হয় ৫০ হাজার টাকা। ভুক্তভোগী ব্যক্তি তাৎক্ষণিক কিছু টাকা দিয়ে ছাড়া পান। পরে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকলে তিনি বাধ্য হয়ে থানায় অজিতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন।
এরপর পুলিশ অজিতকে আটক করে ওই নারীর সন্ধান জানতে চায়। এ সময় অজিতকে দিয়ে ফোন করিয়ে ওই নারীকে জানানো হয় আরেকজন ‘মক্কেল’ পাওয়া গেছে। জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ওই নারী তখন ছুটে আসেন শহরে। পুলিশ তখন তাঁকে আটক করে। গতকাল রোববার অজিত দাস ও ওই নারীকে আটকের পর তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখান হয়। সোমবার আদালতের মাধ্যমে তাঁদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে সোমবার থানায় ভুক্তভোগী আরও দুজন ব্যবসায়ী যোগাযোগ করে ওই চক্রের শিকার হওয়ার কথা তুলে ধরেন।
পুলিশ জানায়, দুই ব্যবসায়ীর একজনকে ট্র্যাপে ফেলে একটি বাসায় নিয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় গলায় জুতার মালা পরিয়ে ভিডিও করা হয়। হাত-পা বেঁধে পেটানো হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময় ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর বাড়ি তাহিরপুর উপজেলায়। আরেকজন শহরের বাসিন্দা, সোনার দোকান আছে তাঁর। তাঁকেও একইভাবে বাসায় নিয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় মারধর ও ভিডিও করা হয়। তাঁর কাছ থেকে সোনা ও টাকাপয়সা নেওয়া হয়েছে। তাঁরা এসব ঘটনার ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ দিয়েছেন।
সদর মডেল থানার ওসি মো. রতন শেখ বলেছেন, ‘আমরা ওই চক্রে আরও কেউ যুক্ত আছে কি না, খতিয়ে দেখছি। থাকলে সবাইকে ধরা হবে।’