মেঘনা নদীতে জাটকা শিকার বন্ধে অভিযানে যাওয়ার মৎস্য বিভাগের অভিযানিক দলের ওপর হামলা চালায় দুবৃত্তরা। এ সময় মৎস্য বিভাগের তিন মাঠকর্মী আহত হন
মেঘনা নদীতে জাটকা শিকার বন্ধে অভিযানে যাওয়ার মৎস্য বিভাগের  অভিযানিক দলের ওপর হামলা চালায় দুবৃত্তরা। এ সময় মৎস্য বিভাগের তিন মাঠকর্মী আহত হন

জাটকা রক্ষায় অভিযানে যাওয়ার সময় হামলা, মৎস্য বিভাগের তিনজন আহত

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় নিষিদ্ধ সময়ে জাটকা নিধন ও অবৈধ জালের ব্যবহার রোধে অভিযানে যাওয়ার পথে মৎস্য বিভাগের আভিযানিক দলের ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে। এতে মৎস্য বিভাগের মাঠ সহকারীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে উপজেলার পাতারহাট লঞ্চঘাটসংলগ্ন এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা–সংলগ্ন মেঘনা ও সন্নিহিত শাখা নদীতে জাটকা ও অবৈধ জালবিরোধী অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে মাঠ সহকারী আবদুল্লাহ আল সিয়াম, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নাজিম উদ্দিন এবং শামীম হোসেন মোটরসাইকেলে করে স্পিডবোট ঘাটের দিকে রওনা দেন। পথিমধ্যে স্টিমারঘাট এলাকার বালুর স্তূপের কাছে পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত দল চলন্ত মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় আভিযানিক দলের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। পরে স্থানীয় পথচারীরা আহতদের উদ্ধার করে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আবদুল কাদের জানান, আহত তিনজনকে হাসপাতালে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ আল সিয়াম ও শামীম তুলনামূলক বেশি আঘাত পেলেও তাঁরা শঙ্কামুক্ত।

হামলায় আহত মাঠ সহকারী আবদুল্লাহ আল সিয়াম বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা সংঘবদ্ধভাবে এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। মাথা, ঘাড় ও হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছি। অন্ধকার ও আকস্মিক হামলার কারণে কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি।’

আহত নাজিম উদ্দীন দাবি করেন, মোটরসাইকেলের হেডলাইটের আলোয় তিনি স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী আলমগীর সরদারকে শনাক্ত করেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই এ হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর সানি বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মেহেন্দীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমিন উদ্দিন বলেন, এ ব্যাপারে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান আছে।

মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলাসংলগ্ন মেঘনা ও সন্নিহিত শাখা নদ-নদী ঘিরে দেশের সবচেয়ে বড় ইলিশের অভয়াশ্রম অবস্থিত। সব ধরনের মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশের ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রমের মধ্যে পাঁচটিতে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। গত ১ মার্চ থেকে এ নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়ে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এ ছাড়া উপকূলের নদ-নদী ও সাগরে নভেম্বর থেকে জুন—এই আট মাস জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে।

অভয়াশ্রমে অভিযানে গেলেই সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ

দেশের সবচেয়ে বড় ইলিশ অভয়াশ্রম মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলাসংলগ্ন মেঘনা নদী ও এর শাখা নদ-নদী ঘিরে অবস্থিত। বিস্তৃত এই অভয়াশ্রম এলাকায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিবছরই জাটকা নিধনের অভিযোগ উঠছে অসাধু জেলেদের বিরুদ্ধে। এর নেপথ্যে স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের একটি প্রভাবশালী চক্র জড়িত। এই অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও প্রায়ই তাঁরা সংঘবদ্ধ জেলেদের হামলার মুখে পড়ছেন। ফলে আইন প্রয়োগের এই চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এমন হামলার ঘটনা নতুন নয়; বরং প্রায় প্রতিবছরই একই চিত্র দেখা যায়। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযানে গিয়ে জেলেদের হামলায় হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) পাঁচজন আহত হন। এর আগে ২০২৩ সালের ১০ মার্চ মেঘনা নদীতে অভিযান চালানোর সময় জেলেদের হামলায় হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা, নৌ পুলিশের পরিদর্শকসহ অন্তত ১৬ জন আহত হন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও ভোলার সীমানার মধ্যবর্তী মেঘনায় ইলিশ নিধনকারীদের হামলায় মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযানকারী দল আক্রান্ত হয়। এতে ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপরিচালক নাসির উদ্দিনসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাদিউজ্জামান শুক্রবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের লোকবল কম। তার ওপর আমাদের কর্মীদের এসব নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে রাতেও অভিযানে যেতে হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন। অনেক সময় প্রশাসনেরও সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায় না। এ জন্য আমরা মৎস্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি, অভিযানে যাওয়ার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে অভিযানে যেতে।’