বর্ষা ঋতু শুরু হলেও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বস্তি মিলছে না। বরং তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিং জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বরিশাল নগরে এক সপ্তাহ ধরে দিন ও রাতে প্রতিদিন পালা করে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা এবং গ্রামপর্যায়ের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চলতি ইলিশ মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলে সাগরে মাছ ধরতে সমস্যার মুখে পড়ছেন। বরফের সংকটে মাছ সংরক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক ট্রলার নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করতে পারছে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকানপাট ও উৎপাদনমুখী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বরিশাল নগরের আমির কুটির এলাকার বাসিন্দা আর আমিন আউটসোর্সিংয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। একে তো ভ্যাপসা গরম, তার ওপরে আমাদের সব কাজ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে একটি কাজের ব্যাঘাত ঘটায় আয় কমে গেছে, অন্যদিকে প্রচণ্ড গরমে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’
বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে নগরের বিসিক শিল্প এলাকাসহ বরিশালের ভারী, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদনে ধস নেমেছে। একই সঙ্গে পোলট্রি ও অন্যান্য শিল্প খাতেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা (ওজোপাডিকো)। এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় ছয়টি জেলা শহরে গ্রাহক আছেন প্রায় পাঁচ লাখ। এর মধ্যে বরিশাল নগরে গ্রাহকসংখ্যা দেড় লাখের বেশি। অন্যদিকে উপজেলা সদর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। বিভাগের পাঁচটি পবিসের আওতায় গ্রাহক আছেন প্রায় ২১ লাখ ৬৫ হাজার।
বরিশাল জাতীয় গ্রিড উপকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পিরোজপুর জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৫৫০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট।
পাওয়ার গ্রিড উপকেন্দ্র বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান পলাশ বুধবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা পিক ও অফপিক আওয়ারে ওঠানামা করে। তবে বর্তমানে আমাদের চাহিদার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য সেটা লোডশেডিং করে সমন্বয় করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিতরণ কর্তৃপক্ষ শিল্পাঞ্চলসহ অধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় কম লোডশেডিং দিয়ে বিদ্যুৎ সমন্বয় করে। এ জন্য গ্রাহক পর্যায়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমবেশি মনে হতে পারে।
বরিশাল নগরে ওজোপাডিকোর দুটি বিতরণ বিভাগ আছে। এর মধ্যে বিতরণ বিভাগ-১-এ প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৯০ মেগাওয়াট। কিন্তু পাচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট। বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুল কুমার স্বর্ণকার বুধবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, এখন চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে এমন অবস্থা চলছে। এ জন্য দিন-রাত মিলিয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা করে পালা করে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অপর দিকে বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের ঘাটতি পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা ৪০ মেগাওয়াট পাচ্ছি ২০ থেকে ২২ মেগাওয়াট। তাই দিন-রাত মিলিয়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা আমাদের লোডশেডিং দিয়ে সমন্বয় করতে হচ্ছে।’ কেন চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জেনারেশন কম হচ্ছে। তাই ঘাটতি হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ–সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রামীণ এলাকার মানুষকে। শহরের তুলনায় পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন উপজেলা ও গ্রামের পরিস্থিতি আরও নাজুক বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। অনেক এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে গিয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালীবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বুধবার দুপুরে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। বাকি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কখন আসবে, কখন যাবে, তারও কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। এই গরমে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’
পাথরঘাটা পৌর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা তুলনামূলক কিছুটা স্বস্তির কথা বললেও সেখানেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। পৌর এলাকার বাসিন্দা আখিরুজ্জামান বলেন, ‘দিন-রাত মিলিয়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। গরমের মধ্যে ছোট শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।’
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বিহারীপুর গ্রামের বোত্রা বাজারের টেলিভিশন ও মুঠোফোন মেরামতকারী বাদল মৃধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করলেও কেউ ধরেন না। অথচ মাস শেষে নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শুধু স্বাভাবিক জীবনযাপনই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং কৃষি ও সেচ কার্যক্রমও। বিশেষ করে রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে।
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য খাত সংকটের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে ৫৮ দিনের সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে এবং শুরু হয়েছে ইলিশ মৌসুম। কিন্তু বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে বরফকলগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী বরফ পাচ্ছেন না ট্রলারমালিকেরা। আবার যে বরফ উৎপাদন হচ্ছে, তার মানও সন্তোষজনক নয়। ফলে কয়েক লাখ সমুদ্রগামী জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বরফকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি বরফের ব্লক তৈরি করতে টানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হওয়ায় বরফ জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে বরফ উৎপাদনে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি উৎপাদিত বরফের মানও কমে গেছে।
বরফসংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় মৎস্যবন্দরগুলোয়। বরগুনার পাথরঘাটায় বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) পরিচালিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্যবন্দরসহ পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর এবং ভোলার বিভিন্ন মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমান উৎপাদন সেই চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে অনেক ট্রলার বরফের অভাবে নির্ধারিত সময়ে সাগরে যেতে পারছে না।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু পাথরঘাটাতেই বেসরকারি খাতে প্রায় ৯০টি বরফকল রয়েছে। অন্যদিকে মহিপুর ও আলীপুর এলাকায় রয়েছে অন্তত ৪০টি বরফকল। এসব কারখানার অধিকাংশই বর্তমানে বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
পাথরঘাটার এম ই আইস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক মো. সোহাগ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন বরফের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ইলিশ মৌসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে চাহিদার ৩০ শতাংশ বরফও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় পানি ঠিকমতো জমাট বাঁধে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বরফের মানও ভালো থাকে না। দ্রুত গলে যায়।’
কলাপাড়ার গাজী আইস প্ল্যান্টের মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী গাজী মজনু বলেন, ‘বরফের সংকট এখন তীব্র। বরফ ছাড়া জেলেরা ট্রলার নিয়ে সাগরে যাবে কীভাবে? পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সেটাও বলতে পারছি না।’
জেলেরা জানান, একটি ট্রলার সাধারণত টানা সাত দিন বা তার বেশি সময় সাগরে মাছ ধরে। এ সময় আহরিত মাছ ট্রলারের সংরক্ষণকক্ষে বরফের মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে যে বরফ পাওয়া যাচ্ছে, তা দ্রুত গলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে বরফ ঠিকমতো জমাট না বাঁধায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে সাগরে মাছ সংরক্ষণ এবং মাছের গুণগত মান বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে অপেক্ষমাণ ট্রলারের জেলে আফজাল হোসেন ও হাবিবুর রহমান বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, বাজার-সদাই নিয়ে বরফের অপেক্ষায় বসে আছেন। কবে বরফ পাবেন, তা-ও নিশ্চিত নয়। ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ, কিন্তু বরফ না থাকলে যাত্রা সম্ভব নয়।