‘মেয়েটা আমার কলিজার টুকরা ছিল। আমার মুখের হাসি ছিল। কিন্তু এখন সব শেষ। ওরা আমার সঙ্গে কেন এমনটা করল? মেয়েটাকে জোর করে দূরে নিয়ে গেছে। কারও কিছু হলো না, কিন্তু মেয়েটা মারা গেল। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাসিমা সুলতানা। কখনো কথা আটকে যাচ্ছে, কখনো চোখের পানি মুছতে মুছতে আবার বলার চেষ্টা করছেন। তাঁর মেয়ে সামিয়া জাহান আর বেঁচে নেই, এ সত্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ প্রাণ হারান সামিয়া। তিনি ছিলেন একটি প্রাইভেট কারে। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন সাইদুল আলম (২৩) নামের এক তরুণ। পুলিশের ভাষ্য, গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। একপর্যায়ে সড়ক বিভাজকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান সামিয়া। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে।
আজ শুক্রবার দুপুরে প্রথম আলোকে মেয়ের কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন সামিয়ার মা নাসিমা সুলতানা। তাঁর কথায় ঘুরেফিরে আসে সামিয়ার শেষ কয়েক দিনের স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলে সৌদি আরবে কাজ করে। সে ছুটিতে এসেছে। ৩০ এপ্রিল তার বিয়ে। ঘরে বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। সামিয়া কত আশা করছিল, বড় ভাইয়ের বিয়েতে আনন্দ করবে। গত বুধ, বৃহস্পতি, শুক্রবার—তিন দিন ধরে নাচ প্র্যাকটিস করল। পরশু রাত ১০টার সময়ও দাওয়াত কার্ডে নাম লিখছিল। ওর মামা বলছিল, তোমার লেখা তো কবির লেখার মতো সুন্দর। সেই মেয়েটা আজ নেই। এটা আমরা কেউ মেনে নিতে পারছি না।’
সামিয়ার মা জানান, যে তরুণের সঙ্গে সামিয়া পতেঙ্গা গিয়েছিলেন, তাঁকে চেনেন না তাঁরা। কলেজে ভর্তি করানোর দিন একবার দেখেছিলেন। এরপর আর দেখেননি। তবে শুনেছেন, ছেলেটা প্রবাসী। তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো দেখি নাই আমার মেয়ের সঙ্গে কী করেছে। আমার বড় ছেলে আর জামাতা এখনো থানায় আছে। লাশ এখনো ফ্রিজে রাখা। বাসায় আনা হয়নি।’
সামিয়া নগরের হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়তেন। স্নাতকের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর মা নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘গতকাল পরীক্ষা দিতে কলেজে গিয়েছিল সামিয়া। একটা ছেলে ওকে নিয়ে গেল। সবাই বলছে সড়ক দুর্ঘটনা। ছেলেটার কিছু হলো না, কিন্তু আমার মেয়েটা মারা গেল। এটা কীভাবে সম্ভব?’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘খুব মেধাবী ছিল সামিয়া। নিয়ম করে পড়তে বসত। ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল...আজ সব শেষ হয়ে গেল।’
পেশায় গৃহিণী নাসিমা সুলতানার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। সামিয়া ছিলেন সবার আদরের। সামিয়ার বাবা মো. আবু তালেব পাটোয়ারী সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, এখন অবসরে। তাঁদের মূল বাড়ি চাঁদপুর হলেও পরিবারটি চট্টগ্রাম নগরের রাহাত্তারপুল এলাকায় থাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, সামিয়া একটি প্রাইভেট কারে করে দুপুরে পতেঙ্গা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে বেলা দুইটার দিকে গাড়িটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফকিরহাট অংশে নিয়ন্ত্রণ হারায়। বেপরোয়া গতিতে থাকা গাড়িটি প্রথমে সড়ক বিভাজকের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়, পরে রেলিংয়ে আঘাত করে। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান সামিয়া। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে দুর্ঘটনার পর সামিয়ার মরদেহ সড়কের ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলটি বন্দর থানার আওতায়। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এরশাদ মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গাড়িটিতে দুজন ছিলেন। দুর্ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন মিলে সামিয়াকে গাড়ি থেকে বের করে সড়কের ওপর রাখেন। পরে তাঁদের দুজনকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরশাদ মিয়া জানান, পরিবারের সদস্যরা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তদন্ত শেষে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে। এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
পুলিশ বলছে, গাড়ির চালক সাইদুল আলমের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। তিনি কাতারপ্রবাসী। কখন দেশে ফিরেছেন, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন—কখনো তিন মাস, কখনো দুই মাস আগে বলে উল্লেখ করছেন। বর্তমানে তিনি থানায় আছেন।
ঘটনার পর গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বসে সাইদুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি গাড়ি বেপরোয়াভাবে আমাকে অতিক্রম করে। আমি ভয় পেয়ে যাই। গাড়ির স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। পরে প্রথম সড়ক বিভাজকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। তারপর রেলিংয়ে ধাক্কা লাগে। এতে সামিয়া মাথায় আঘাত পান।’