নদের তলদেশে তিতাস গ্যাসের সঞ্চালন পাইপলাইন ছিদ্র হয়ে প্রায় দেড় মাস ধরে গ্যাস বের হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে গ্যাসের চাপ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। সোমবার দুপুরে কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায়
নদের তলদেশে তিতাস গ্যাসের সঞ্চালন পাইপলাইন ছিদ্র হয়ে প্রায় দেড় মাস ধরে গ্যাস বের হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে গ্যাসের চাপ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। সোমবার দুপুরে কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায়

নদের তলদেশে গ্যাসের লাইনে ছিদ্র, দেড় মাসেও ঠিক করা যায়নি

প্রায় দেড় মাস ধরে নদের পানির নিচে তিতাস গ্যাসের উচ্চ চাপের সঞ্চালন লাইন থেকে বুদ্‌বুদ উঠছিল। গত এক সপ্তাহে তা বেড়ে ফোয়ারার মতো রূপ নিয়েছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয়ের পাশাপাশি নদীপাড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র গন্ধ। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কিশোরগঞ্জ শহরবাসী।

দুর্ঘটনাস্থল কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায়। অন্তত দেড় মাস আগে নদীর পানির নিচ থেকে গ্যাসের বুদ্‌বুদ উঠতে দেখেন তাঁরা। প্রথমে নির্গমন কম ছিল। পরে ধীরে ধীরে বাড়ে। গত এক সপ্তাহে গ্যাস বের হওয়ার চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পানির ওপর পর্যন্ত ফোয়ারার মতো উঠতে থাকে।

সারা দেশে গ্যাসের সংকট, আর কটিয়াদীতে কোটি কোটি টাকার গ্যাস হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। অবহেলার কারণে এ দায় তিতাস কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে এবং সঠিক তদন্ত হতে হবে।
খালেদ সাইফুল্লাহ, চেয়ারম্যান, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড সূত্র জানায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে নরসিংদীর মনোহরদী থেকে কিশোরগঞ্জ শহরে আবাসিক গ্যাস সরবরাহের জন্য ৮ ইঞ্চি ব্যাসের একটি উচ্চচাপ সঞ্চালন পাইপলাইন টানা হয়। পাইপটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশ দিয়ে গেছে। এটি কেবল সঞ্চালন লাইন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে সংযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই।
অবৈধ সংযোগের চেষ্টা থেকেই বিপর্যয়

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায় জুন মাসের শুরুতে সরকারি অনুমোদনহীন একটি চুন কারখানা স্থাপন করা হয়। কারখানার মালিক সুনামগঞ্জের ছাতকের দেলোয়ার হোসেন তালুকদার।

প্রায় দেড় মাস ধরে বের হচ্ছে গ্যাস

স্থানীয় লোকজনের দাবি, কারখানার মালিক এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজনের হস্তক্ষেপে রাতের আঁধারে নদীর নিচে থাকা তিতাসের উচ্চ চাপের পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেন। ওই দিন বৃষ্টি নামায় কাজ শেষ করা যায়নি। তবে ছিদ্র হয়ে যাওয়া পাইপ দিয়ে বুদ্‌বুদ আকারে গ্যাস বের হতে থাকে। শুরুতে চোরকাঁটা ও কচুরিপানা দিয়ে স্থানটি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। সম্প্রতি বেশি চাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে, দুর্গন্ধ ছড়ালে বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর চুন কারখানা বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেটে পড়েন।

দিনরাত অনবরত গ্যাস বের হতে থাকায় দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্কে বিরাজ করছে। কেউ কেউ জানালেন, দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে গেলে গ্যাসের গন্ধ নাকে লাগে। চোখ জ্বালাপোড়া করে। এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, ‘চুন কারখানার জন্য এক ব্যক্তি ওই জায়গা থেকে গ্যাস নিতে চাইছিল। এর পর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। তখন পানি কম ছিল। পানি হওয়ার পর প্রায় এক মাস ধরে গ্যাসের বুদ্‌বুদ দেখা যাচ্ছে। পাঁচ-ছয় দিন ধরে বেশি গ্যাস বের হচ্ছে। তিতাসের লোকজন কয়েকবার গ্যাস বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা পারতেছে না।’

চুন কারখানা মালিক দেলোয়ার হোসেনের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে গ্যাসের অবৈধ সংযোগে সহযোগিতার বিষয়ে জানতে কথা হয় স্থানীয় ইউপি সদস্য মিলন মিয়ার সঙ্গে। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি কারখানার মালিককে চিনি। কথাও হয়েছে। তবে তাঁর কোনো কাজে আমার সহযোগিতা নেই।’

সমন্বয়হীনতা ও দেরিতে ঘুম ভাঙা

কমবেশি করে দেড় মাস ধরে গ্যাস বের হলেও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউই শুরুতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টি স্বীকার করে মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে কম বের হওয়ায় তিনি বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি। চাপ বাড়ার পর বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানান হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রথম আলোকে কটিয়াদীর ইউএনও শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, তিনি পাঁচ দিন আগে বিষয়টি জানতে পেরে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে জানান এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নদীর পাড়ে যাতায়াত বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদনহীন চুন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্যাসের ছিত্র মেরামতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে

এদিকে ৯ জুলাই প্রথম দফায় তিতাসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এলেও দৃশ্যমান মেরামত শুরু হয়নি। পাঁচ দিন আগে থেকে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হলেও এখনো ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। মেরামত কাজ তদারকি করছেন কিশোরগঞ্জ তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিক্রয় কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, পাইপটি অন্তত পানির ৮ ফুট নিচে রয়েছে। তীব্র স্রোতের কারণে পানি সরিয়ে কাজ করতে গেলেই বালু ঢুকে পড়ছে। ঝুঁকি এড়াতে ৯টি ভালভ (গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র) মধ্যে ৯০ শতাংশ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ কারণে কিশোরগঞ্জ শহরে গ্যাস–সংকট তৈরি হয়েছে।

মেরামতকাজ শুরুর বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তিতাসের ময়মনসিংহ বিভাগের সিস্টেম অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স শাখার আঞ্চলিক অপারেশন (ভালুকা) ব্যবস্থাপক মো. শামীম হোসেন জানান, শুরুতে সমস্যা বড় ছিল না। একটু একটু করে গ্যাস বের হচ্ছিল। পাঁচ দিন ধরে বেশি গ্যাস বের হচ্ছে। এ ছাড়া তথ্য পেতেও বিলম্ব হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের উচ্চ চাপের মূল সঞ্চালন পাইপলাইন বন্ধ হয়ে করে দেওয়ায় পুরো কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কিশোরগঞ্জ শহরে তিতাসের ৯ হাজার আবাসিক গ্রাহক।

শহরের বাদিন্দা জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শহরে গ্যাস একেবারেই বন্ধ। রান্নাবান্না করতে কষ্ট হচ্ছে। আমার বাসায় ভাড়ায় থাকা শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাচ্ছে।’

বিষয়টি নিয়ে উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, সারা দেশে গ্যাসের সংকট, আর কটিয়াদীতে কোটি কোটি টাকার গ্যাস হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। অবহেলার কারণে এ দায় তিতাস কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে এবং সঠিক তদন্ত হতে হবে।