
অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় পর্যটকদের থাকার জন্য ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিথিশালা নির্মাণ করেছিল সরকার; কিন্তু নির্মাণের পর ১৪ বছর কেটে গেলেও এক রাতের জন্য সেখানে কোনো পর্যটক থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। অতিথিশালার রেজিস্টারও পুরো ফাঁকা। কোথাও কোনো অতিথির নাম-ঠিকানা নেই।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের মসূয়া গ্রামে সত্যজিৎ রায়ের এই পৈতৃক ভিটার অবস্থান। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বাড়ি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিনই পর্যটকেরা আসেন; কিন্তু কটিয়াদীতে ভালো আবাসিক হোটেল না থাকায় দূরদূরান্তের পর্যটকেরা রাত্রিযাপন নিয়ে বিপাকে পড়েন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১১ সালে ভিটার পাশে অতিথিশালা নির্মাণ করে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য পদ সৃষ্টির বিষয়ে পর্যটন করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো চিঠির উত্তরও এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত মূল কাজ হয়নি।
দোতলা অতিথিশালা, সীমানাপ্রাচীর ও রাস্তাঘাট উন্নয়নে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে অতিথিশালা নির্মাণ ও আসবাব কেনায় বরাদ্দ ছিল ৫২ লাখ টাকা। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অতিথিশালাটি উদ্বোধন করা হয়। এরপর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নানা জটিলতায় কখনো কোনো পর্যটক সেখানে রাত কাটাননি।
১৩ আগস্ট সরেজমিনে অতিথিশালার প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। অতিথিশালা দেখভালে কোনো তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ঝাড়ুদার সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস সেটি দেখাশোনা করেন। অতিথিশালার পাশেই তাঁর বাড়ি। ডেকে আনার পর সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস ফটক খুলে দেন।
অতিথিশালার ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, সম্প্রতি রং করা হয়েছে। নিচতলা ও দোতলায় আলাদা খাট, সোফা, তিনটি শৌচাগার ও দুটি ডাইনিং টেবিল। আছে ড্রেসিং টেবিল, আলমিরাসহ প্রয়োজনীয় আসবাব। আইপিএস ও ইন্টারনেট সংযোগও আছে। অতিথিশালার রেজিস্টারে কোনো পর্যটকের নাম পাওয়া গেল না। কোথাও কলমের আঁচড় পড়েনি।
সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ি দেখতে আসা কোনো পর্যটক অতিথিশালায় রাত কাটিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সঞ্জিৎ বলেন, ‘না’। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অতিথিরা এক-দুবার থেকেছেন। অতিথিশালায় থাকতে কত টাকা লাগে, সেটিও জানেন না সঞ্জিৎ। তাঁর ভাষ্য, সুযোগ-সুবিধা থাকলে অতিথিরা এখানে থাকতে পারতেন; কিন্তু ব্যবস্থা না থাকায় কাউকে আগ্রহী হতে দেখা যায় না।
অতিথিশালাটি উদ্বোধনের পর উপজেলা প্রশাসনের অধীন ছিল; কিন্তু অতিথিশালা পরিচালনার জন্য কোনো তত্ত্বাবধায়কের (কেয়ারটেকার) পদ সৃষ্টি করা হয়নি। পরে সঞ্জিৎ চন্দ্র দাসকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অতিথিশালার চাবি তাঁর কাছে থাকে। তবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি আলাদা কোনো বেতন পান না।
থাকার মানুষ আসে না বলেই এত দিন কেউ থাকেনি। তবে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সেখানে থেকেছেন। অতিথিশালাটি এখন মেরামত করা হয়েছে। চাইলে যে কেউ থাকতে পারবেন।শামিমা আফরোজ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কটিয়াদী
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, উদ্বোধনের পর দীর্ঘদিন ধরে অতিথিশালাটি দিন–রাত তালাবদ্ধ থাকত। দেখাশোনার লোক না থাকায় একসময় জানালার গ্রিল ও বিদ্যুতের তার চুরি হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় আসবাব। পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও বিকল হয়ে পড়ে। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে শৌচাগার। ভবনের পেছনে মাদকসেবীদের আড্ডাও বসত।
জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের আবাসনের প্রয়োজনে অতিথিশালাটি সংস্কার করে ব্যবহার করা হয়। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট কটিয়াদী সফরে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের থাকার প্রয়োজন হতে পারে—এমন চিন্তা থেকেই অতিথিশালাটি দ্রুত সংস্কার করা হয়। সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস জানান, ‘অতিথিশালায় যা কিছু করা হয়েছে, সবই প্রধানমন্ত্রীর কটিয়াদী সফরকে কেন্দ্র করে।’
১৩ আগস্ট সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা দেখতে আসেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার দুই বন্ধু সাব্বির আহমেদ ও কবির মিয়া। তাঁরা ভিটার সামনে ছবি তুলছিলেন। অতিথিশালার প্রসঙ্গ তুলতেই কবির বললেন, হাতের কাছে এক গ্লাস পানি পাওয়া যেখানে কঠিন, সেখানে দূরের লোকজনের থাকার ব্যবস্থা করা আরও কঠিন। অতিথিশালাটি দেখিয়ে সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘জিনিস বানালে হয় না, যত্ন নিতে হয়। সেবা দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়।’
অতিথিশালা থেকে ৫০ থেকে ৬০ কদম দূরে মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়। অফিস সহকারী আবু নাঈম আকন্দ বলেন, প্রতিদিনই দূরদূরান্তের কেউ না কেউ সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় আসেন। তবে ভিটা দেখতে এসে কেউ অতিথিশালায় থেকেছেন বলে তাঁর মনে পড়ে না।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য পদ সৃষ্টির বিষয়ে পর্যটন করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো চিঠির উত্তরও এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত মূল কাজ হয়নি।
অতিথিশালা নির্মাণের পর কেন দেখাশোনা করার লোক নিয়োগ দিতে আলাদা পদ সৃষ্টি করা হয়নি, তা জানতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খালিদ মেহেদি হাসানের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আকতার আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন; কিন্তু আকতার আহমেদের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ধরেননি।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য লোকবল লাগবে, এটা সরকার জানে না, এটা হতে পারে না। পরবর্তী উপজেলা কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিকারের চেষ্টা করবেন বলে জানান।
জানতে চাইলে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আফরোজ প্রথম আলোকে বলেন, থাকার মানুষ আসে না বলেই এত দিন কেউ থাকেনি। তবে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী কয়েক দিন আগে সেখানে থেকেছেন। তাঁর ভাষ্য, অতিথিশালাটি এখন মেরামত করা হয়েছে। চাইলে যে কেউ থাকতে পারবেন।