
বেলা তিনটা বাজে তখন। ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। বাঁশ ও ত্রিপলের ছাউনির একটি কক্ষে পবিত্র কোরআন পড়াচ্ছিলাম ২০ জন ছাত্রীকে। হঠাৎ বিকট শব্দে কানে তালা লেগে গেল। হুড়মুড় করে ঘরের ওপর পড়া মাটির স্তূপ আর ইটের টুকরা চাপা দিল আমাদের। চাপা পড়া অবস্থায় শুনলাম কান্নার শব্দ আর চিৎকার। এরপর মাটি সরিয়ে কোনোমতে বের হয়ে এলাম। পরে জানলাম, পাঁচজন মেয়ে মারা গেছে, আহত হয়েছে অনেকে। ভাগ্যক্রমে মাটিচাপা থেকে কোনোমতে বাঁচতে পারলাম। এ জীবনে এমন ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি হইনি।’
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ( ক্যাম্প-৫) আশ্রয়শিবিরের মেয়েদের হেফজখানার (মাদ্রাসা) ওপর দেয়াল ও মাটি ধসে পড়ার ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে যান প্রতিষ্ঠানটির ২২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিক্ষক বেগম জাহান। গতকাল বিকেলের ঘটনার পর থেকে তিনি স্বাভাবিক হতে পারছেন না। ভুলতে পারছেন প্রিয় ছাত্রীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা। তবু কী ঘটেছিল, জানতে চাইলে মুঠোফোনে প্রথম আলোর কাছে তিনি এভাবেই ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
কুতুপালং ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকের মোচরাবাজার এলাকায় ওই হেফজখানার অবস্থান। এর পাশেই রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে টিনের ছাউনির একটি মসজিদ, নাম মসজিদুল কুবা। পাহাড় ধসে হেফজখানা ও মসজিদ দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি এসে দেয়ালের ওপর পড়ে প্রথমে। এরপর মাটিসহ দেয়ালটি ধসে পড়ে হেফজখানার ওপর। সেখানে তখন ৪০ জন ছাত্রী ছিল। শিক্ষক ছিলেন চারজন। একটি কক্ষে বেগম জাহান ২০ জন ছাত্রীকে পড়াচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় চাপা পড়ে পাঁচজন রোহিঙ্গা মেয়েশিক্ষার্থী মারা যায়। গুরুতর আহত আটজন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয় আরও অন্তত ১৪ জনকে। হতাহত সবার বয়স ৯-১৫ বছর।
বেগম জাহান নিজেও কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের এ-৭ ব্লকের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমত ছিল বলে প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাও করিনি।’
শিক্ষক বেগম জাহান বলেন, হেফজখানায় সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি কক্ষে পবিত্র কোরআন শরিফ শিক্ষা দেওয়া হয়। অন্যান্য দিনের মতো বুধবার সকালে পাঠদান শুরু হয়। তখন ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। বেলা তিনটার দিকে তিনি একটি কক্ষে ২০ জন মেয়েকে পবিত্র কোরআন পড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে পাশের পাহাড়ের একটি অংশসহ ইটের দেয়াল ভেঙে মাদ্রাসার ওপর পড়ে। কক্ষের পশ্চিম পাশের একটি দরজা খোলা ছিল। মাটি সরিয়ে কোনোমতে তিনিসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু পূর্ব পাশের দুটি দরজা চাপা পড়ায় অনেকে বের হতে পারেনি। সেখানেই পাঁচজন মাটিচাপা পড়ে মারা গেছে, অনেকে গুরুতর আহত হয়েছে।
বেগম জাহান বলেন, মেয়েদের কান্নাকাটি, চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন রোহিঙ্গারা। তাঁরা বিধ্বস্ত ঘর সরিয়ে ১০-১৫ জন মেয়েকে উদ্ধার করেন। এরপর ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন, ক্যাম্প প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আরও কয়েকজনকে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করেন।
মুঠোফোনে বেগম জাহান বলেন, ‘মাটিচাপা পড়া মেয়েদের কথা ভুলতে পারছি না। ঘটনার কয়েক মিনিট আগেও তারা পবিত্র কোরআন পড়ছিল। আর সেভাবেই চলে গেল। তাদের মুখ চোখে ভাসছে।’
উখিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান বলেন, আশ্রয়শিবিরের ৫ নম্বর ক্যাম্পের নিহত মাদ্রাসাছাত্রী রাশেদা বেগম (১৩), উন্মে নেজাতুল (১৩), উন্মে সালমা (১২), উমাইসা বিবি (১৩) ও ৩ নম্বর ক্যাম্পের শহিদা বেগমকে (১১) আশ্রয়শিবিরের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এই ঘটনার দুদিন আগে গত রোববার দিবাগত রাতে উখিয়ার বালুখালী, জামতলী ও কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী শিশুসহ অন্তত আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ইতিমধ্যে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনা হয়েছে। আরও কয়েক হাজারকে সরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ভূমিধসে প্রাণহানি রোধে প্রতিটা ক্যাম্পে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।