
একসময় তাঁর হাত দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ঢাকাই সিনেমার কালজয়ী ও জনপ্রিয় সব গান। সুরও করেছেন অনেক গানের। দেশের খ্যাতনামা সব শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছেন তাঁর গানে। সেসব গান ফিরেছে মানুষের মুখে মুখে। অথচ যিনি এসব গান লিখেছেন, তিনি থেকে গেছেন অন্তরালে।
এভাবে বয়স বেড়েছে। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। অর্থাভাবে বাধ্য হয়েছেন ঢাকা ছাড়তে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। সেখানে শয্যাশায়ী হয়ে কাটাচ্ছেন দিন। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কেউ খোঁজও নিচ্ছেন না। এভাবে তাঁর অসুখ ও অসচ্ছলতার গল্পও থেকে যাচ্ছে অন্তরালেই। তিনি হলেন অনেক কালজয়ী গানের রচয়িতা আলমগীর কবির।
‘চোখের জলে আমি ভেসে চলেছি’, ‘খোদা, তোমার এ দুনিয়ায় আমি এক এতিম অসহায়’, ‘তুমি ডুব দিয়ো না জলে কন্যা’, ‘মাটির কোলে খাঁটি মানুষ, খুঁজে পাওয়া দায়’, ঢাকাই ছবির এমন জনপ্রিয় গান লিখেছেন এই গীতিকার।
দেড় দশক আগে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে জন্মভিটা বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের তালুক চরদুয়ানি গ্রামে গিয়ে থাকছেন তিনি। সেখানে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকলেও চিকিৎসা চলছে না ঠিকমতো। আলমগীর কবিরের মেয়ের আক্ষেপ, চলচ্চিত্র ও গানের অঙ্গনের কেউ তাঁর বাবার খোঁজ নিচ্ছেন না। একটা জীবন গানের জন্য কাটিয়ে দিলেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতিও।
চলচ্চিত্র, দেশাত্মবোধক, আধুনিক ও ইসলামি মিলিয়ে ১১ হাজারের বেশি গান লিখেছেন আলমগীর কবির। তাঁর লেখা অনেক জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমীন, রথীন্দ্রনাথ রায়, দিলরুবা খান, সুবীর নন্দী, খুরশীদ আলম, ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মতো খ্যাতিমান শিল্পী।
তিনি ‘ঝিনুক মালা’, ‘মাটির কোলে’, ‘মিয়া ভাই’, ‘শিমুল পারুল’, ‘ভাই আমার ভাই’, ‘নাগ মহল’, ‘শশী পূর্ণ’, ‘কোহিনূর’সহ অনেক সিনেমার জন্য গান লিখেছেন, যার বেশির ভাগ গানই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘রাজা তুমি ঘুমিয়ে আছো’ শিরোনামে একটি অ্যালবামের গানের গীতিকার তিনি।
তিন ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আলমগীর কবিরের সংসার। বড় ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। দুই ছেলে বরগুনার পাথরঘাটায় কলেজে পড়াশোনা করেন। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে ফ্যাশন ডিজাইনে পড়াশোনা শেষ করেছেন। ছেলের সহায়তা ও এলাকায় থাকা সামান্য জমিজমা দিয়ে টেনেটুনে চলে সংসার। তবে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী আলমগীর কবিরের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য পরিবারের নেই।
আলমগীর কবিরের ছোট মেয়ে তাফান্নুম সুবাইতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বাবা একসময়ের বিখ্যাত গীতিকার। অথচ তাঁর ন্যূনতম জীবনধারণের নিশ্চয়তাটুকুও রাষ্ট্র তাঁকে দিতে পারেনি। অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি শয্যাশায়ী। অথচ কেউ খোঁজ নিচ্ছেন না। এটা আমাদের চরমভাবে ব্যথিত করে।’
স্বামীর দুরবস্থার কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে আলমগীর কবিরের দ্বিতীয় স্ত্রী শাহনাজ বেগমের। তিনিই সেবাযত্ন করেন অসুস্থ স্বামীর। প্রথম স্ত্রী ও তাঁর সন্তানেরা থাকেন অন্যত্র।
আক্ষেপ করে শাহনাজ বেগম বলেন, ‘তাঁর প্রতি রাষ্ট্র ও চলচ্চিত্রমাধ্যমের সবার উপেক্ষা ও উদাসীনতা আমাদের কষ্ট দেয়। মানুষটা চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারছি না, এটা যে কত বড় বেদনার, তা বোঝাতে পারব না। তিনি না পেলেন একটা সচ্ছল জীবন, না পেলেন কাজের কোনো স্বীকৃতি।’
আলমগীর কবিরের লেখা ১০৭টি গান নিয়ে ‘হৃদয় খুলে রেখো না’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাছে ১১টি ডায়েরি রয়েছে। প্রতিটি ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন ১ হাজার ২৭টি গান। রোগে শয্যাশায়ী এখন আর খুব কথাও বলতে পারেন না এই গীতিকার। অন্যের সাহায্য ছাড়া পারেন না চলতেও। একবার ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন। আরেকবার পড়ে গিয়ে পেয়েছেন কোমরে আঘাত। ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে।
শুক্রবার তালুক চরদুয়ানী গ্রামে আলমগীর কবিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একতলা পাকা বাড়ির একটি কক্ষে শয্যাশায়ী তিনি। কেমন আছেন, জানতে চাইলে নিস্তেজ স্বরে বললেন, ‘এই তো আছি, ভালোই আছি।’
আলমগীর কবিরের লেখা বিখ্যাত গানগুলোর কথা তুলতেই আবেগাপ্লুত হন। ভিজে ওঠে তাঁর চোখ। হয়তো সেই দিন আর এই দিনের তফাতের কথা ভেবেই।