ভবনের জানালা দিয়ে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি এস এম তারেকের লাশ দেখছেন স্বজনেরা। আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর বউ বাজার এলাকায়
ভবনের জানালা দিয়ে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি এস এম তারেকের লাশ দেখছেন স্বজনেরা। আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর বউ বাজার এলাকায়

ক্ষেপণাস্ত্রে বাংলাদেশির মৃত্যু

‘বাবাকে একনজর দেখতে পেরেছি, এটিই সান্ত্বনা’

বাসার আঙিনায় অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে কফিনে সাদা কাফনে মোড়ানো লাশ। দূর থেকে স্বজনেরা তাকিয়ে আছেন অ্যাম্বুলেন্সের দিকে। জানাজা ও দাফনের আগে ক্ষণিকের জন্য কাফনে মোড়ানো লাশের চেহারা দেখার সুযোগ পান স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে ও কয়েকজন স্বজন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি এস এম তারেকের লাশ ঘিরে আজ শনিবার সকালে এই চিত্র দেখা যায় চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ঈদগাহ বউবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। গত ১ মার্চ রাতে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা এস এম তারেক। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর লাশ বাংলাদেশে এসে পৌঁছে।

কফিন না খোলার জন্য বলেছেন চিকিৎসকেরা। এ জন্য রাতে লাশ এলেও কেউ চেহারা দেখতে পাননি। জানাজার আগে কফিন খুলে শুধু স্ত্রী, মেয়েসহ কয়েকজন স্বজন দেখেছেন। এক মাসের মধ্যে লাশ দেশে এসেছে, দেশের মাটিতে কবর দেওয়া হচ্ছে, এটাই বড় সান্ত্বনা।
মোশাররফ হোসেন, নিহত তারেকের মামাতো ভাই।

গতকাল দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে কফিনবন্দী লাশটি নেওয়া হয় চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের ওই ভাড়া বাসায়। সেখানে তারেকের পরিবার বসবাস করে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জানাজা শেষে লাশটি হালিশহরের ঈদগাহ বউবাজার এলাকায় দাফন করা হয়।

তারেক নিহত হওয়ার এক মাস পর তাঁর চেহারা একনজরের জন্য দেখতে পেয়েছে তাঁর একমাত্র মেয়ে তাসনিম তামান্না। কিশোরী তামান্না নির্বাক হয়ে শুধু বাবার লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু বলার মতো অবস্থা তার ছিল না। সে প্রথম আলোকে বলে, ‘বাবাকে একনজর দেখতে পেরেছি, এটিই সান্ত্বনা।’

এস এম তারেক ২০০৯ সালে বাহরাইনে যান। বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হালিশহরের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পাঁচতলা একটি ভবনের তৃতীয় তলায় থাকেন তারেকের স্ত্রী ও মেয়ে। ভবনের আঙিনায় তারেকের কফিন বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। পাশে রয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। তাঁরা তাকিয়ে আছেন অ্যাম্বুলেন্সের দিকে।

ভবনের আঙিনায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছে নিহত তারেকের কফিনবন্দী লাশ। আজ সকালে তোলা

স্বজনেরা জানান, রাতে লাশ বাসায় আনার পর সকাল ১০টা পর্যন্ত কফিন খোলা হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শেই কফিন খুলতে নিষেধ করা হয়। তবে সকাল ১০টার দিকে তারেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও একমাত্র মেয়ে তাসনিম তামান্নাসহ স্বজনদের অ্যাম্বুলেন্সে থাকা তারেকের চেহারা একনজর দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর জানাজার জন্য সেখান থেকে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়।

নিহত তারেকের মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কফিন না খোলার জন্য বলেছেন চিকিৎসকেরা। এ জন্য রাতে লাশ এলেও কেউ চেহারা দেখতে পাননি। জানাজার আগে কফিন খুলে শুধু স্ত্রী, মেয়েসহ কয়েকজন স্বজন দেখেছেন। এক মাসের মধ্যে লাশ দেশে এসেছে, দেশের মাটিতে কবর দেওয়া হচ্ছে, এটাই বড় সান্ত্বনা।’

যুদ্ধের এই পরিস্থিতির মধ্যে লাশ দেশে আনার বিষয়ে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মোশাররফ। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে মন্ত্রীরা লাশ গ্রহণ করে আমাদের দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা ও পরিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে সরকার। আরও ১০ লাখ টাকা দেবে তারা। এর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য তারেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তারেকের মেয়ের পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন।’

সকালে তৃতীয় তলার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। একটি কক্ষে কান্না করছেন এস এম তারেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম। তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন অন্য স্বজনেরা। বাসার সামনে আশপাশের এলাকার স্বজনদের উপস্থিতি দেখা গেছে। এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. জাবেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাড়াটে হলেও দেশে এলে তারেক সবার সঙ্গে মিশতেন। এভাবে তাঁকে হারাব কেউ ভাবিনি।’

তারেকের সঙ্গে বাহরাইনে থাকতেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোলাইমান। লাশ আসার পর তাঁর বাসার সামনে ছুটে আসেন তিনি। সোলাইমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাহরাইনে শিপইয়ার্ডে হাজারের বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। দেশের লোকজনকে চাকরি দেওয়ার পেছনে তারেকের অনেক অবদান আছে। আজ দেশপ্রেমিক একজন মানুষকে হারালাম আমরা।’

নিহত মহসিনের সঙ্গে বাহরাইনে একই কক্ষে থাকতেন তাঁর চাচাতো ভাই এস এম নুর হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, ‘কক্ষে মহসিনের খাটটি এখনো খালি পড়ে আছে। একদিকে নিজের বাঁচা–মরার লড়াই, অন্যদিকে তাঁর পরিবারের ছবি যখন চোখের সামনে আসে, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। সামনের দিনগুলো তাঁরা কীভাবে পাড়ি দেবেন জানি না।’

কফিনবন্দী লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায়

নুর হোসেন যে ড্রাইডকে কাজ করেন, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি দেড় কিলোমিটার দূরে। তিনি বলেন, ‘ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলেও লক্ষ্যচ্যুত হয়ে এগুলো আশপাশের এলাকায় এসে পড়ছে। আবার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পড়ার আগে এগুলোকে প্রযুক্তির সাহায্যে ধ্বংস করা হচ্ছে। দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস কিংবা লক্ষ্যবস্তুতে পড়ছে।’ নুর হোসেন বলেন, ‘একেকটি বিকট শব্দে বুক কেঁপে উঠছে। আর প্রতিবারই আল্লাহকে ডাকি। প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকি। কখন কী হয়ে যায়। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, বুঝতে পারছি না। দিন দিন যুদ্ধ পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে। আর কোনো প্রাণহানি না ঘটুক। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। বন্ধ হোক যুদ্ধ, এটিই আমরা চাই।’