ডুমুরিয়া উপজেলার মেছাঘোনা গ্রামের পাশে কার্তিকডাঙ্গা বিলে চাষ করা হয়েছে ব্রি-১০৮
ডুমুরিয়া উপজেলার মেছাঘোনা গ্রামের পাশে কার্তিকডাঙ্গা বিলে চাষ করা হয়েছে ব্রি-১০৮

খুলনায় উচ্চফলনশীল ব্রি-১০৮ চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে

খুলনায় চলতি বোরো মৌসুমে মাঠপর্যায়ে উচ্চফলনশীল (উফশী) আধুনিক একটি নতুন ধানের জাত চাষে কৃষকের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি-১০৮ ধানকে উচ্চ ফলন, চালের গুণগত মান ও বাজার সম্ভাবনার কারণে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় এ জাত অনুমোদন পায়। ব্রি-১০৮-এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৮ দশমিক ৭ টন। অনুকূল পরিবেশে এর ফলন আরও বেশি হতে পারে। এ ধানের চাল কাটারি, নাজির শাইল ও জিরা শাইলের চেয়েও কিছুটা সরু এবং দেখতে অনেকটা পোলাওয়ের চালের মতো। প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু হওয়ায় ভোক্তাদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। রান্নার পর দীর্ঘ সময় ভাত ভালো থাকে—এটিও এ জাতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ধানগাছ শক্ত হওয়ায় বাতাসে সহজে হেলে পড়ে না এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়। প্রতিটি শীষে ২৫০ থেকে ২৭০টি পর্যন্ত ধান পাওয়া যায়। পাতার আকার বড় হওয়ায় খড়ের পরিমাণও বেশি হয়, যা কৃষকদের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বছর সীমিত পরিসরে মাঠপর্যায়ে চাষ করে ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় চলতি মৌসুমে এ জাতের আবাদ বেড়েছে। ব্রি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিএডিসি যৌথভাবে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় প্রদর্শনী প্লট ও বীজবর্ধন কার্যক্রম চালাচ্ছে, যাতে দ্রুত এ জাতের চাষ সম্প্রসারণ করা যায়।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মেছাঘোনা গ্রামের পাশে কার্তিকডাঙ্গা বিলে গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে এ ধানের চাষ করেন সৌখিন চাষি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের সাবেক পরিচালক এস এম আতিয়ার রহমান। তিনি ব্রি থেকে নতুন জাতের বীজ সংগ্রহ করে নিজের জমিতে আবাদ করেন।

আতিয়ার রহমান বলেন, ২০১০ সালে ব্রি-৫০ (বাংলামতি) চাষের পর ১৬ বছর ধরে তিনি ব্রির উদ্ভাবিত প্রায় সব প্রিমিয়াম মানের ধান আবাদ করছেন। তাঁর মতে, এখনো ব্রি-২৮ কৃষকের কাছে জনপ্রিয়। তবে ধীরে ধীরে ব্রি-৫০, ৫৮, ৬৩, ৯০, ১০০, ১০২, ১০৪ ও বিনা ধান-২৫-এর মতো জাতগুলো জায়গা করে নিচ্ছে।

আতিয়ার রহমান আরও বলেন, গত বছর ব্রি-১০৮ চাষের পর এর চাল খেয়ে ঐতিহ্যবাহী দাদখানি চালের স্বাদ পেয়েছেন। যদিও এ ধানের কোনো বাংলা বা বাণিজ্যিক নাম এখনো দেওয়া হয়নি, তিনি একে ‘নতুন দাদখানি চাল’ নামে ডাকেন। তাঁর ভাষ্য, এ ধানের আতপ চালের ভাত রান্নার পর ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা এবং সেদ্ধ চালের ভাত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। মাঠে ব্যাপক ফলনও হয়েছে। প্রতিদিন তাঁর খেত দেখতে আশপাশের কৃষকেরা আসছেন এবং আগামী মৌসুমে এ জাত চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

ডুমুরিয়ার মেছাঘোনা গ্রামের কৃষক আবু সাইদ বলেন, ‘ব্রি-১০৮ গত বছরও ভালো ফলন দিয়েছিল। এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে। আগামীতেও আমরা এ জাতের আবাদ করব।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ব্যাপক সরবরাহ ও সাধারণ ভোক্তার নাগালে পৌঁছাতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। বর্তমানে সীমিত পরিসরে এ চালের বাজারদর আতপ ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং সেদ্ধ ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি।

ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, ব্রি ধান-১০৮ উচ্চফলনশীল ও উন্নত মানের হওয়ায় কৃষক ও ভোক্তা—দুই পর্যায়েই গ্রহণযোগ্যতা পাবে। ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কৃষকেরা লাভবান হবেন। চলতি বোরো মৌসুমে এ ধানের কয়েক শ প্রদর্শনী প্লটের পাশাপাশি বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চাষ করা হয়েছে।