
সুরম্য প্রাসাদ, প্রশস্ত অন্দরমহল, শানবাঁধানো পুকুরঘাট সবই আছে। তবে কালের ধুলায় ঢেকে গেছে সব। বিশাল সব থাম, সিংহ দরজা আর বাড়ির খিলানে উপেক্ষার শেওলা। নানা বৃক্ষ আর ঝোপঝাড়ের রাজত্ব সর্বত্র। তবু ভাঙা ইটের দেয়ালগুলো যে কাঠামো নিয়ে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, তা থেকেই এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী চিনে নিতে অসুবিধা হয় না।
লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত লক্ষ্মীনারায়ণ জমিদার বাড়ির কথা বহু লোকের মুখে শুনেছি। গত মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে যাওয়ার সুযোগও মিলে গেল। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ইটের গায়ে লেখা আছে বাড়ির নানা প্রজন্মের পুরোনো সব দিনের কথা। সেসব উজ্জ্বল দিন পেরিয়ে ৩০০ বছরের পুরোনো বাড়িটি তার শেষ দশায় এসে সাম্প্রদায়িক হিংসার মুখে গতি হারাল। বাড়িটিকে একা রেখে চলে গেল তার বাসিন্দারা। সেই ইতিহাস তো সবার কমবেশি জানা। তবু বলি আরেকবার।
১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন। এর তিন সপ্তাহ আগে কলকাতায় ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক হানাহানি যা, ‘দা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। উত্তপ্ত সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ায় নানা গুজবের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্রই। তৎকালীন নোয়াখালীর অন্তর্গত লক্ষ্মীপুরেও ছিল চাপা আতঙ্ক। লক্ষ্মীপূজার দিন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে আক্রমণ করা হলো জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে। লুট হলো শাহপুর বাজারের সব হিন্দু ব্যবসায়ীর দোকান। হিংসা, হানাহানি আর লুটপাট ছড়িয়ে পড়ল বারুদের মতো। এই অবস্থায় অনেক হিন্দু পরিবার এক কাপড়ে ঘর ছাড়লেন। চলে গেলেন কলকাতায়। অনেকের মতো লক্ষ্মীনারায়ণ জমিদার বাড়ির বাসিন্দারও ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। ৭৭ বছর আগের সেই কালো অধ্যায় ধারণ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তাদের বসতবাড়ি।
লক্ষ্মীপুর সদর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে দালাল বাজারে পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা জমিদারবাড়িটি দালাল বাজার জমিদার বাড়ি নামেও পরিচিত। তবে এটির প্রকৃত নাম লক্ষ্মীনারায়ণ জমিদারবাড়ি। অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর নিখুঁত কারুকাজ শোভিত এই বাড়িতে গিয়ে একসময়ের শোভা শুধু অনুমান বা আন্দাজ করা যায়। এটির বিশাল বিশাল থাম, সিঁড়ি ঘর, সিংহদরজা, মূল প্রাসাদ, কাচারি ঘর, অন্দরমহল, রংমহল, হেঁশেল, শানবাঁধানো ঘাট সবখানে গজিয়েছে গাছপালা আর ঝোপঝাড়। বাড়িটিতে বেশ কয়েকটি বড় বটগাছও দেখা গেল। মেঝে থেকে ওপরের দিকে তাকালে এখন জটিল অন্ত্রের মতো জড়ানো হাজারো শিকড়ের বিচিত্র বিস্তার দেখা যায়।
বাড়িটিকে ঘিরে নানা কাহিনি প্রচলিত আছে। এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, ভারতের কলকাতা থেকে লক্ষ্মীনারায়ণ বৈষ্ণব নামের এক ব্যবসায়ী লক্ষ্মীপুরে এসে এখানে ব্যবসা শুরু করেন। তার উত্তরসূরিরা ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলে ইংরেজদের বাণিজ্যিক এজেন্ট ছিলেন। স্থানীয় লোকেরা তাদের ব্রিটিশদের দালাল বলে আখ্যায়িত করে। তখন থেকেই এলাকাটি দালালবাজার হিসেবে পরিচিত। তারাই এখানে জমিদারি শুরু করেন।
লক্ষ্মীনারায়ণের বংশধরেরা বাড়িটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলে এটি বহুবার নানা চক্র দখলের চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কেউ দখল করতে পারেনি। বহুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি প্রশাসনের নজরে আসে এবং পুরোনো স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে এটি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি।
ভবনটিতে আছে রাজকীয় প্রবেশদ্বার। ভেতরের প্রাসাদ, প্রশস্ত অন্দরমহল, শানবাঁধানো পুকুরঘাট। বেশির ভাগ অংশে ছাদ নেই। বিশাল বিশাল লোহার বিমগুলো নতমুখী। যেকোনো সময় নিচে পড়ে যেতে পারে। দর্শনার্থীদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২১ সালে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনে ব্যবস্থাপনায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এই বাড়ির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে রক্ষায় এই প্রাচীন নির্মাণ প্রয়োজন ছিল বলে স্থানীয় লোকজন জানান। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এটিকে বিলীন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।
ধ্বংসপ্রাপ্ত এই বাড়ি ঘুরে দেখতে অনেকেই আসেন। তাঁদের একজন আমিনুল হক বললেন, ‘কিরাম একখান সৌন্দর্যমণ্ডিত বাড়ি, ইডার কী হাল হইছে দেখছেননি। ইডারে বাঁচাইব কেডা।?’
বাড়ির রংমহলের পেছনে অন্দরমহলের ছাদ এখনো আছে। দিনদুপুরেও সেখানে অন্ধকার। চরে বেড়াচ্ছে একটি কালো ছাগল। ভেতরে গিয়ে হঠাৎ চমকে উঠলাম। দেখলাম স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে একটা জীর্ণশীর্ণ জটাধারী একজন মানুষ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মানুষটিকে মনে হলো অতীতের জৌলুশের এমন করুণ পরিণতিতে তিনি লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চাইছেন।