
‘আমার নাতির খবর লইয়া আইছেন?’ নিজের বাড়ির দিকে আসা অপরিচিত মানুষ দেখলেই এমন প্রশ্ন করেন ৭১ বছর বয়সী ইসমাইল শেখ। জবাবে ‘না’ শুনলেই তাঁর মুখটা মলিন হয়ে আসে। চোখ নামিয়ে ধীরপায়ে বাড়ির উঠানে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে বসে পড়েন তিনি। তারপর শূন্য চোখে চেয়ে থাকে দূরে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে নাতনি রিথি আক্তারের ছবি হাতে নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন বৃদ্ধ ইসমাইল শেখ। কখনো গ্রামের এ প্রান্তে, কখনো অন্য এলাকায়। আত্মীয়ের বাড়ি, রেলস্টেশন, বাসস্টেশনসহ সম্ভাব্য যেখানেই রিথির সন্ধান মিলতে পারে, সেখানেই ছুটছেন তিনি। অসুস্থ শরীর নিয়েও নাতনিকে খুঁজছেন। তাঁর একটাই কথা, ‘আমার রিথিরে আমার বুকের মাইদ্দে ফিরায়া দেন।’
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের লাকচতল ভিটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল শেখ। গত ২৯ আগস্ট বিকেলে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল ১০ বছর বয়সী রিথি আক্তার। এরপর এক মাসের বেশি সময় পেরিয়েছে, তবে এই শিশুটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রিথি লাকচতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা শাহাদাত হোসেন ও মা জোনাকি আক্তার। প্রায় ৯ বছর আগে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। পরে জোনাকি বিয়ে করে নতুন সংসারে চলে যান। এর পর থেকেই রিথি ও তার বড় বোন স্মৃতি আক্তার (১৩) নানার বাড়িতে থাকছে। নানার অভাবের সংসারে তাদের বেড়ে ওঠা।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, ২৯ আগস্ট দুপুরে নানি নুরজাহান বাড়ির হাঁসের বাচ্চা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ নিয়ে রিথির সঙ্গে কিছুটা রাগ করে কথা বলেছিলেন পরে রিথি পাশের বাড়ির সমবয়সী এক শিশুর কাছে নিজের অভিমানের কথা জানিয়েছিল। বিকেলে হঠাৎ রিথিকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজ শুরু করেন।
রিথির নানার বাড়িতে গেলে ঘরের ভেতর থেকে তার স্কুলব্যাগ নিয়ে আসেন নানি নুরজাহান। ব্যাগ থেকে বের করেন বই-খাতা। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘খালি মনে হয়, অক্কন যদি আয়া পড়তো, তে তো ভালা অইতো। আপনেরা যে আইতাছুইন, হে (রিথি) যাদি এরুমবা (এভাবে) আয়া পড়তো। অহন তো আয়ে না।’
রিথি আক্তারকে খুঁজে না পেয়ে মামাতো বোন আফরিন আক্তার শ্রীপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আফরিন আক্তার বলেন, ‘আমরা সবাই যে যেখানে পারছি, খুঁজে যাচ্ছি।’
জিডির পর পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে জানিয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, একই সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও শিশুটির খোঁজ করা দরকার।