পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই ফল চাষের সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি মাটি ও ভিন্ন জলবায়ু—সব মিলিয়ে আম, কলা, আনারস, কাঁঠাল থেকে শুরু করে ড্রাগন ও কাজুবাদামের মতো ফল চাষের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে এখানে। সে কারণে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফল উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির চিত্র সব জেলায় সমান নয়। উৎপাদনের দৌড়ে বান্দরবান ও রাঙামাটি এগিয়ে থাকলেও খাগড়াছড়ি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পার্বত্য তিন জেলায় মোট ফল উৎপাদন ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ তিন বছরে ফল উৎপাদন বেড়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি।
কৃষি বিভাগ এটিকে পাহাড়ে ফল চাষ সম্প্রসারণের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছে। তবে উৎপাদনের এই বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে বান্দরবান ও রাঙামাটি থেকে। খাগড়াছড়িতে উৎপাদনের গতি তুলনামূলক ধীর, আর মোট অংশের হিসাবেও জেলা পিছিয়ে রয়েছে।
চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা পানির অভাব ও খারাপ যাতায়াতব্যবস্থা। রাঙামাটিতে হ্রদ থাকায় পানি ও যোগাযোগ-দুটো সুবিধাই আছে। খাগড়াছড়িতে সে সুযোগ নেই।সুজন চাকমা, খামারি, খাগড়াছড়ির সদর উপজেলা।
পার্বত্য তিন জেলায় বর্তমানে অন্তত ৪৬ ধরনের ফলের চাষ হয়। আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, কাজুবাদাম, রাম্বুটান, ড্রাগন ফল, লিচু ও পেয়ারা—সবই উৎপাদিত হয় পাহাড়ে। তবু বাস্তবতা হলো, এই বৈচিত্র্যের সুফল বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে কম পাচ্ছে খাগড়াছড়ি।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে পুঁজির ঘাটতি রয়েছে। যাতায়াতব্যবস্থা ও সেচের পানির অভাবও উৎপাদন কম হওয়ার বড় কারণ। তবে ধীরে ধীরে ফলের উৎপাদন বাড়ছে। চাষিদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
উৎপাদনে এগিয়ে বান্দরবান-রাঙামাটি
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, পার্বত্য তিন জেলার মোট ফল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই এসেছে বান্দরবান থেকে। বান্দরবানে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ফল। একই সময়ে রাঙামাটিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে খাগড়াছড়িতে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টনে। এই চিত্র নতুন নয়। আগের দুই অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থাৎ তিন বছর ধরেই উৎপাদনের ব্যবধান প্রায় অপরিবর্তিত।
বান্দরবানে কলা ও আনারসের বড় আকারের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে। রাঙামাটিতেও আম ও কলার উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে খাগড়াছড়িতে এসব ফলের চাষ থাকলেও বড় পরিসরের বাগান তুলনামূলক কম।
ফসলভিত্তিক হিসাবেও পার্থক্য স্পষ্ট। কলা, আম ও আনারস—তিনটি ফলই পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান উৎপাদন ভিত্তি। বান্দরবানে কলা ও আনারসের বড় আকারের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে। রাঙামাটিতেও আম ও কলার উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে খাগড়াছড়িতে এসব ফলের চাষ থাকলেও বড় পরিসরের বাগান তুলনামূলক কম।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বান্দরবানে ফল চাষকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাহাড়ি ঢালে বাগান স্থাপন, উন্নত চারা বিতরণ, চাষিদের প্রশিক্ষণ ও কিছু ক্ষেত্রে বাজার সংযোগ তৈরির উদ্যোগ উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
এই সাফল্যের প্রতিফলন মিলেছে জাতীয় পরিসংখ্যানেও। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের শীর্ষ পাঁচ ফল উৎপাদনকারী জেলার তালিকায় রয়েছে পটুয়াখালী, ভোলা, বান্দরবান, রাঙামাটি ও বরগুনা। পার্বত্য অঞ্চলের দুটি জেলা এ তালিকায় জায়গা করে নিলেও খাগড়াছড়ি সেখানে নেই।
কেন পিছিয়ে খাগড়াছড়ি
একই প্রাকৃতিক পরিবেশে থেকেও খাগড়াছড়ি কেন পিছিয়ে—এ প্রশ্নের উত্তরে উঠে এসেছে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা। কৃষি কর্মকর্তা, ফলচাষি ও বাজার-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলাটিতে ফল চাষের বড় অংশ এখনো পারিবারিক বা ছোট পরিসরের। অনেক চাষিই মিশ্র চাষের অংশ হিসেবে ফলের গাছ লাগান। বড় আকারের বাণিজ্যিক বাগান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলনামূলক কম।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা সেচ ও প্রযুক্তির ঘাটতি। পাহাড়ি ফল চাষ এখনো অনেকটাই বৃষ্টিনির্ভর। খাগড়াছড়ির অনেক এলাকায় আধুনিক সেচব্যবস্থা নেই। খরার সময় গাছের পরিচর্যা ব্যাহত হয়, ফলন কমে যায়। উন্নত চারা, ফল ছাঁটাই বা রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও পর্যাপ্ত নয়।
তৃতীয়ত, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল। দুর্গম এলাকার অনেক চাষি জানান, ফল উৎপাদনের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজারে নেওয়া। পাহাড়ি সড়কের দুরবস্থার কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। সংরক্ষণাগার না থাকায় পাকা ফল দ্রুত নষ্ট হয়। ফলে অনেক সময় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চাষিরা বাগান সম্প্রসারণে আগ্রহ হারান।
চতুর্থত, বিনিয়োগ ও নতুন উদ্যোগের অভাব। বান্দরবানে যেভাবে ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম কিংবা কফির মতো নতুন ফসল নিয়ে পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, খাগড়াছড়িতে সে ধরনের উদ্যোগ তুলনামূলক কম। এতে উচ্চমূল্যের নতুন বাজার থেকেও জেলা পিছিয়ে পড়ছে।
ফলচাষিরা যা বলছেন
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নে প্রায় ৪০ একর জায়গাজুড়ে মংশেতু মারমার ফলের বাগান। বাগানের বেশির ভাগ অংশজুড়ে আমের গাছ। পাশাপাশি রয়েছে রাম্বুটান, অ্যাভাকাডো, কাঁঠাল ও পেয়ারা। তিনি বলেন, পাহাড়ে ফল ফলানো কঠিন নয়, কিন্তু টিকিয়ে রাখা কঠিন। বৃষ্টি ঠিক থাকলে ফলন ভালো হয়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে সেচের পানি না পেলে গাছ নষ্ট হয়ে যায়। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর আয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা হলে আয় আরও বাড়তে পারে।
সদর উপজেলার আরেক খামারি সুজন চাকমার বাগানের আয়তন প্রায় ৮০ একর। তাঁর বাগানে রয়েছে ২৬ জাতের ফল। তিনি বলেন, চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা পানির অভাব ও খারাপ যাতায়াতব্যবস্থা। রাঙামাটিতে হ্রদ থাকায় পানি ও যোগাযোগ—দুটো সুবিধাই আছে। খাগড়াছড়িতে সে সুযোগ নেই।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ১৫ জন ফলচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন ফল চাষে আগ্রহ থাকলেও চারা, প্রশিক্ষণ ও বাজার—এই তিন জায়গায় সহায়তা কম। ফলে অনেকেই ফল চাষে এগোতে সাহস পাচ্ছেন না।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে ফল উৎপাদন বাড়ছে, এটি ইতিবাচক। তবে খাগড়াছড়িতে অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি, সেচের অপ্রতুলতা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, কিছু নির্দিষ্ট রোগ এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণের কারণ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম। এ ছাড়া অন্য দুই পার্বত্য জেলার চেয়ে এখানে ফলের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেশি। বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তুলতে আধুনিক সেচব্যবস্থা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ফল সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের অবকাঠামো একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।