
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাশিয়াত যাহিনকে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়ায় বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরে তিনি লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনার পর ওই শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে সনদ তুলতে নিষেধ করা হয়েছে।
ওই শিক্ষার্থী নাম মুজিবুর রহমান। তিনি মার্কেটিং বিভাগের এমবিএ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষকের মেসেজে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়ার জেরেই তাঁর সনদ আটকে রাখা হয়েছে। তবে শিক্ষক মাশিয়াত যাহিনের দাবি, শুধু ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়ার কারণে নয়, শিক্ষার্থীর আচরণসহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন। সনদ আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই।
শিক্ষকের একটি বার্তায় ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন মুজিবুর রহমান। এ ঘটনাকে ‘অশোভন ও শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ’ উল্লেখ করে গত ২৫ আগস্ট মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেহের নিগারের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দেন শিক্ষক মাশিয়াত যাহিন। এরপর তাঁর সনদপত্র তুলতে নিষেধ করা হয়।
শিক্ষকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি উপাচার্যকে জানানোর পর তাঁর পরামর্শে অভিযোগটি সহ–উপাচার্যের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন। সনদ আটকে রাখার বিষয়ে বলেন, তাঁর সনদ আটকে রাখার বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। যেহেতু শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ এসেছে, তাই সাময়িকভাবে তাঁকে সনদ তুলতে নিষেধ করা হয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তি শেষে ওই শিক্ষার্থী অবশ্যই সনদ তুলতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সহকারী অধ্যাপক মাশিয়াত যাহিন ওই শিক্ষার্থীর ইন্টার্নশিপ সুপারভাইজার ছিলেন। ওই শিক্ষার্থীর ইন্টার্নশিপ প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ২ দশমিক ৫০ দেওয়া হয়। ফলাফল প্রকাশের পর মুজিবুর রহমান ওই শিক্ষককে হোয়াটসঅ্যাপে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি মেসেজ দেন। বিষয়টি সারা জীবন মনে রাখবেন বলে মেসেজে উল্লেখ করেন। উত্তরে শিক্ষক অভিনন্দন জানিয়ে তাঁকে একটি মেসেজ দেন। শিক্ষকের সেই বার্তায় মুজিবুর রহমান ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন।
এ ঘটনাকে ‘অশোভন ও শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ’ উল্লেখ করে গত ২৫ আগস্ট মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেহের নিগারের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দেন শিক্ষক মাশিয়াত যাহিন। তার আগে ওই শিক্ষক ঘটনাটি বিভাগীয় প্রধানকে জানালে বিষয়টি একাডেমিক কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়। সভায় উপস্থিত শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার পর রেজিস্ট্রার দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়।
লিখিত অভিযোগে ওই শিক্ষক উল্লেখ করেন, এমবিএ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুজিবুর রহমান ইন্টার্নশিপ কার্যক্রমে যথাযথ মনোযোগ ও আন্তরিকতা দেখাননি। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে তিনি ইন্টার্নশিপ প্রতিবেদন জমা দেন। এরপরও তাঁর শিক্ষাজীবনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিবেদনের গুণগত মানের ভিত্তিতে তাঁকে নম্বর দেওয়া হয়। ফল প্রকাশের পর মুজিবুর রহমান তাঁকে ইন্টার্নশিপে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা জানান। এ সময় তিনি ব্যঙ্গাত্মক ও শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে শিক্ষককে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁকে মনে রাখার কথা বলেন। তিনি ওই বক্তব্যের জবাব দিলে শিক্ষার্থী তাতে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন। এ প্রতিক্রিয়া শিক্ষকের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ।
‘আমি একটি মেসেজে ধন্যবাদ দিয়েছি। উনি রিপ্লাই দিয়েছেন। সেখানে আমি একটি রিঅ্যাক্ট দিয়েছি। এখন একটি “হা হা” রিঅ্যাক্টের জন্য আমার সার্টিফিকেট আটকানো যায় কি না, সেটাই আমি জানতে চাই।’মুজিবুর রহমান, এমবিএ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ
অভিযোগের পর গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ তুলতে গেলে তাঁর সনদ আটকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, মার্কেটিং বিভাগের প্রধান তাঁকে সনদ তুলতে নিষেধ করেন। কারণ জানতে চাইলে জানানো হয়, তাঁর বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার দপ্তরে একটি অভিযোগ আছে। এ জন্য তিনি আপাতত সনদ তুলতে পারবেন না।
মার্কেটিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মেহের নিগার বলেন, মুজিবুরের বিরুদ্ধে তাঁর সুপারভাইজার একটি অভিযোগ করায় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেজিস্ট্রার দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে সিদ্ধান্ত আসার পর ওই শিক্ষার্থী সনদ উত্তোলন করতে পারবেন।
তাঁকে অযথা বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীর ওপর তাঁর ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে আত্মসম্মানের বিষয় থেকে তিনি অভিযোগ করেছেন।মাশিয়াত যাহিন, সহকারী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ
শিক্ষার্থী মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি একটি মেসেজে ধন্যবাদ দিয়েছি। উনি রিপ্লাই দিয়েছেন। সেখানে আমি একটি রিঅ্যাক্ট দিয়েছি। এখন একটি “হা হা” রিঅ্যাক্টের জন্য আমার সার্টিফিকেট আটকানো যায় কি না, সেটাই আমি জানতে চাই।’ তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষায় তিনি সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৩ দশমিক ৭৪ পেয়েছেন। কিন্তু ইন্টার্নশিপে তিনি ২ দশমিক ৫০ পাওয়ায় সব মিলিয়ে তাঁর সিজিপিএ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩৪। ইন্টার্নশিপে বেশি নম্বর পেলে তাঁর ফলাফল আরও ভালো হতো। অপ্রত্যাশিত ফলাফলের কারণে তিনি হতাশায় ভুগছেন।
মাশিয়াত যাহিন দাবি করেন, তাঁকে অযথা বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীর ওপর তাঁর ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে আত্মসম্মানের বিষয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সাময়িকভাবে সনদ স্থগিত রাখা যায়।