
রাঙামাটির শহরের ফিশারি বাজারে কাপ্তাই হ্রদের তীরঘেঁষা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। কোথাও শ্রমিকেরা বরফ ভাঙছেন, কোথাও ঘাটে ভিড় করা নৌকা থেকে মাছ নামানো হচ্ছে। ঝুড়ি ভরে মাছ একের পর এক ট্রাকে তোলা হচ্ছে। তবে সেই ঝুড়িতে চোখে পড়ে না হ্রদের একসময়কার পরিচিত কার্পজাতীয় মাছ—রুই, কাতলা কিংবা মৃগেল। সাম্প্রতি এমন চিত্র দেখা গেছে।
ঘাটে থাকা জেলে ও শ্রমিকদের ভাষ্য, কাপ্তাই হ্রদের মাছের চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে আহরিত মাছের বড় অংশই কাচকি, চাপিলা ও অন্যান্য ছোট প্রজাতি। অথচ একসময় এই হ্রদে বড় আকারের কার্পজাতীয় মাছ ছিল সহজলভ্য। গত কয়েক বছরে সেই দৃশ্য প্রায় পাল্টে গেছে।
কাপ্তাই হ্রদ ও আশপাশে আগ্রাসী প্রজাতির চাষ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি দরকার। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব নয়।মো. মনজুরুল কিবরীয়া, উপাচার্য, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কাপ্তাই হ্রদে একসময় প্রায় ৮০ প্রজাতির মাছ ছিল। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬-এ। অনেক পরিচিত দেশীয় প্রজাতি প্রায় হারিয়ে গেছে। পানির স্তর হ্রাস, দূষণ, পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়া এবং আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার—এসব কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিএফডিসি রাঙামাটির ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিম বলেন, বর্তমানে অবতরণ ঘাটে ৩৬ প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে। সরপুঁটি ও সাদা ঘনিয়া প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাঁর মতে, পানির গভীরতা কমে যাওয়া ও দূষণ বড় কারণ। বিলুপ্তপ্রায় মাছ রক্ষায় গবেষণা চলছে। একই সঙ্গে মাছের আকার ছোট হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিএফডিসির তথ্যমতে, কাপ্তাই হ্রদের দেশীয় কার্পজাতীয় মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ ও ঘনিয়া উল্লেখযোগ্য। বিদেশি কার্পের মধ্যে রয়েছে গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প ও কমন কার্প। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, মোট মাছ আহরণ বাড়লেও এই আট প্রজাতির উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। দেড় দশক ধরে এ প্রবণতা অব্যাহত। বিপরীতে ট্যাংরা, কাচকির মতো ছোট প্রজাতির মাছ বেড়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০০১-০২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে কার্পজাতীয় মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে। সবচেয়ে বেশি কমেছে গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প ও কমন কার্প। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই তিন প্রজাতির পাশাপাশি মৃগেল ও ঘনিয়ার কোনো আহরণ হয়নি।
কাপ্তাই হ্রদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪-০৫ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত আট প্রজাতির কার্প মাছ আহরণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ৫৬ টন। পরবর্তী ১০ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫১৮ টনে। একসময় মোট আহরিত মাছের ৫ শতাংশ ছিল কার্পজাতীয়; বর্তমানে তা নেমে এসেছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০০১-০২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে কার্পজাতীয় মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে। সবচেয়ে বেশি কমেছে গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প ও কমন কার্প। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই তিন প্রজাতির পাশাপাশি মৃগেল ও ঘনিয়ার কোনো আহরণ হয়নি।
কাপ্তাই হ্রদ বৃহত্তম মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পরিচালক সুকান্ত দাশ বলেন, ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত হ্রদে পলি জমার সমস্যা ছিল না। পরে পলি জমতে শুরু করলে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমে যায়। এখন ব্যবসায়ীরা মূলত কাচকি ও চাপিলার ওপর নির্ভরশীল। এতে জেলে ও ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কমছে সরকারের রাজস্বও।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) রাঙামাটির গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে মোট মাছ আহরণের ৮১ শতাংশই ছিল কার্পজাতীয়। সময়ের সঙ্গে এই হার কমে বর্তমানে প্রায় শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে চাপিলা ও কাচকির মতো ছোট পেলাজিক মাছের (যেসব ছোট মাছ পানির ওপর বা মাঝখানে ঘুরে বেড়ায়, তলদেশে থাকে না) উৎপাদন বেড়েছে।
বিএফডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদ থেকে ৯ হাজার ৬৭২ টন মাছ আহরণ করা হয়েছে, যার বিপরীতে রাজস্ব এসেছে ২১ কোটি টাকার বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আহরণ ছিল ২০ হাজার ৯৫৮ টন।
রাজস্বের একটি অংশ দিয়ে হ্রদে মাছের পোনা ছাড়া হয়। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১০ টন পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে কার্পজাতীয় মাছও রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এসব পোনা বড় হতে পারছে না। অতিরিক্ত আহরণের কারণে ডিম দেওয়ার সুযোগও কমছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, বছরে চার মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও অনেক সময় তা মানা হয় না। মশারি জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে পোনাসহ সবই উঠে আসে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর।
বিএফআরআই রাঙামাটির ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপকেন্দ্রপ্রধান মো. ইশতিয়াক হায়দার বলেন, অতিরিক্ত আহরণ, পলি জমে প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং সাকার ফিশের মতো আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার—সব মিলিয়ে কার্পজাতীয় মাছ কমে গেছে। আগের চারটি প্রজননক্ষেত্র পলি জমে নষ্ট হলেও নতুন একটি প্রজনন এলাকা শনাক্ত হয়েছে, যা কিছুটা ইতিবাচক দিক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হ্রদে সাকার ফিশ, পাকু ও পিরানহার মতো আগ্রাসী প্রজাতির উপস্থিতি স্থানীয় মাছের আবাস ও খাদ্যচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি কাচকি ও তেলাপিয়ার মতো দ্রুত বংশবিস্তারকারী মাছ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতি হুমকিতে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে মোট আহরিত মাছের প্রায় ৯০ শতাংশই ছোট ও দ্রুত প্রজননশীল প্রজাতির। কার্পজাতীয় মাছ ও কাচকির খাদ্য একই হওয়ায় খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে, যা কার্পের সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ।
গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বর্তমানে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মো. মনজুরুল কিবরীয়া। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাপ্তাই হ্রদ ও আশপাশে আগ্রাসী প্রজাতির চাষ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি দরকার। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ছিল ৯০ মেগাওয়াট সক্ষমতার জন্য। কিন্তু বর্তমানে সেটিকে প্রায় ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। অথচ হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। যখন একসঙ্গে বেশি টারবাইন চালানো হয়, তখন দ্রুত পানি কমে যায়। ফলে শুকনো মৌসুমে পানির সংকট আরও বাড়ে এবং হ্রদের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়।