
ফুলজোড় নদ দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় বগুড়ার শেরপুরের এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কোম্পানির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১০টায় শেরপুর উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের বাজার এলাকা থেকে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন সীমাবাড়ি ইউনিয়নের বেটখৈর গ্রামের তৌহিদুর রহমান ওরফে বাবু (৪৫) ও সীমাবাড়ি বাজার এলাকার আলী রেজা বিশ্বাস (৫০)।
আজ সোমবার দুপুরে ওই দুজনকে বগুড়ার আদালতে পাঠানো হয়। বিকেলে আদালত তাঁদের দুজনের জামিন মঞ্জুর করেছেন। বগুড়ার আদালত পুলিশে পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকায় এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের অবস্থান। এটি বগুড়া–৫ আসনের (শেরপুর-ধুনট) সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের পরিবারের মালিকানাধীন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সিকিউরিটি ইনচার্জ গোলাম কিবরিয়া বাদী হয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে থানায় একটি মামলা করেন। এতে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরপুর থানা-পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সিয়াম হোসেন বলেন, থানায় লিখিত অভিযোগ এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার পর গতকাল রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টায় দুজনকে সীমাবাড়ি বাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় এই মামলার বিবাদীগণসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা রাজাপুর গ্রামে এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কোম্পানির সামনে এসে বাদীর কাছে দুই লাখ টাকার চাঁদা দাবি করেন। বিবাদীরা তাঁকে আগামী তিন দিনের মধ্যে কোম্পানির মালিককে চাঁদার টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেন।
তবে মামলার আসামি ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁরা জানান, কারখানার বর্জ্য পদার্থ ফেলার কারণে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ফুলজোড় নদে মাছসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। এর প্রতিবাদে ও স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলার ধানগড়ায় মানববন্ধন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ধানগড়া পরিবেশপ্রেমী সচেতন নাগরিক সমাজের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলার চান্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একই দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সচেতন নাগরিক সমাজ ও ফুলজোড় নদী রক্ষা আন্দোলন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিজেরা করি ও ভূমিহীন সংগঠন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর উদ্যোগে কর্মসূচি পালিত হয়। পরে আন্দোলনকারীরা বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় এসআর কেমিক্যাল ও মজুমদার কোম্পানির সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করেন।
মামলার আসামি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার শিমলা গ্রামের ফাহিম ফয়সাল মুঠোফোনে বলেন, এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কোম্পানি ও মজুমদার প্রোডাক্টস লিমিটেড কোম্পানির বর্জ্য করতোয়া ও বাঙালী নদীতে ফেলা হয়। এতে নদীর পানির দূষিত হয়ে মারা যাচ্ছে বিভিন্ন আকারের মাছসহ জলজ প্রাণী। এর প্রতিবাদে তাঁরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। এসব কর্মসূচিতে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের নামে শেরপুর থানায় চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। থানা–পুলিশ সঠিক তদন্ত না করেই মামলা রেকর্ড ও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার আরেক আসামি পরিবেশবাদী সংগঠন স্বাধীন জীবনের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক আবদুর রাজ্জাক সরকার বলেন, ‘২৫ ফেব্রুয়ারি আমার এক আত্মীয়ের জানাজা নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলাম। তবু আমাকে আসামি করা হয়েছে।’ তবে এর আগে সংগঠনের ব্যানারে ফুলজোড় নদ দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (অ্যাডমিন) আলী রেজা বলেন, তাঁদের কোম্পানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগারের মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। বিষাক্ত বর্জ্য নদের পানিতে ফেলানোর অভিযোগ সত্য নয়।
শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, মামলাটি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
বাপার সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি দীপক কর জানান, বগুড়ার ধুনট উপজেলার ফুলজোড় গ্রাম থেকে বাঙালি নদী ফুলজোড় নামে রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রবাহিত হচ্ছে। এটি উপজেলার নলকা এলাকায় ইছামতী নদীর সাথে মিলে হুরাসাগরে পড়েছে। প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদীর দুই পাড়ে দুইটি জেলার কয়েক লাখ মানুষের বসবাস।
দীপক কর বলেন, ‘আমরা শুধু মাছ মরার বিষয়টি বুঝতে পারছি। কিন্তু নদীতে বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণির জীবন হুমকিতে। উজান থেকে নেমে আসা বিভিন্ন কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থের কারণে এমন হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য স্থানীয় লোকজনের আন্দোলনকে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে আটকানো যাবে না।’ এ বিষয়ে তিনি দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।