
সেদিন ছিল মঙ্গলবার। ফেনী শহরের ডায়বেটিক হাসপাতাল থেকে সঙ্গী-সাথিসহ সাদা প্রাইভেট কারে নিজ এলাকায় ফিরছিলেন ফুলগাজী উপজেলার তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক। বেলা ১১টার দিকে শহরের একাডেমি সড়কের বিলাসী সিনেমা হলের সামনে একরামুলের গাড়ির গতিরোধ করে দাঁড়ায় একটি অটোরিকশা। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয় একাধিক ককটেল। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘিরে ফেলেন গাড়িটি। চালকসহ একরামুলের সঙ্গে থাকা চার ব্যক্তি বেরিয়ে আসেন প্রাণ বাঁচাতে। হামলাকারীরা তাঁদের কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করেন; কিন্তু বের হতে পারেননি একরামুল। গাড়ির ভেতরেই তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর বেশ কয়েকটি গুলি করা হয়। এরপর হামলাকারীরা গুলিবিদ্ধ একরামুলকে ভেতরে রেখেই গাড়িটি পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেন।
হত্যায় জড়িতরা নিজাম হাজারীর অনুসারী
ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ায় থাকতেন একরামুল হক। গ্রামের বাড়ি ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের বন্দুয়া দৌলতপুরে। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর আজকের এই দিনে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন একরামুল। হত্যার পর স্বজনেরা দাবি করেছিলেন, একরামের হত্যার জন্য তিন কোটি টাকা দেন উপজেলা নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী (মিনার); আর হত্যায় জড়িত বলে র্যাব-পুলিশ যাঁদের চিহ্নিত করেছিল সে সময়, তাঁদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীর ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।
এক যুগ পার হলেও হত্যা মামলায় আসামিদের আপিলের শুনানি উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে দীর্ঘ আট বছর। বিগত কয়েক বছর দফায় দফায় হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ গঠন করা হলেও মামলাটি শুনানি শুরুই হতে পারেনি। নিম্ন আদালতের রায়ে ৩৯ আসামির ফাঁসির দণ্ড হলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি ১৬ আসামি। নৃশংস এ ঘটনার দীর্ঘ এক যুগ অতিক্রম হওয়ায় সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন নিহত একরামের স্বজনেরা।
হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবিদুল ইসলাম (আবিদ) একরামকে প্রথম গুলি করেন বলে র্যাব সেই সময় জানিয়েছিল। তাঁর মা লায়লা জেসমিন ছিলেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক৷ ফেনী-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর আপন ফুফাতো ভাই তিনি। ওই ঘটনায় নিহত একরামের বড় ভাই জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে ফুলগাজীর বিএনপি নেতা ও উপজেলা নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ওরফে মিনার চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩৩ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। মামলাটির তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৩০ আগস্ট ৫৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ফেনী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ। মামলা চলাকালীন হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি সোহেল র্যাবের সঙ্গে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান।
এক যুগেও বিচার শেষ হয়নি
এক যুগ পার হলেও হত্যা মামলায় আসামিদের আপিলের শুনানি উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে দীর্ঘ আট বছর। বিগত কয়েক বছর দফায় দফায় হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ গঠিত হলেও মামলাটির শুনানি শুরুই হতে পারেনি। নিম্ন আদালতের রায়ে ৩৯ আসামির ফাঁসির দণ্ড হলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি ১৬ আসামি। নৃশংস এ ঘটনার দীর্ঘ এক যুগ অতিক্রম হওয়ায় সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন নিহত একরামের স্বজনেরা।
উচ্চ আদালত সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের মে মাসে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে একরাম হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানি কার্যতালিকাভুক্ত হয়েছিল। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে ওই বছরের জুন মাসের শেষের দিকে মামলাটি শুনানির জন্য ধার্য ছিল। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সে সময় গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকার পতনের পর বেঞ্চটি ভেঙে যায়।
একরাম হত্যার এক যুগ অতিবাহিত হলেও অজানা আতঙ্কে এখনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না তাঁর স্বজনেরা। পরিবারের একটি সূত্র জানায়, নিহত একরামের স্ত্রী ও তিন সন্তান ঘটনার পর থেকে রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছেন।
পরে ২০২৫ সালে উচ্চ আদালতে এই মামলার শুনানির জন্য নতুন করে আরেকটি বেঞ্চ গঠন করা হয়েছিল। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরীন আক্তারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে একরাম হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির কার্যক্রম ওই বছরের জুন মাসের কথা থাকলেও সেটি হয়নি বলে জানিয়েছেন উচ্চ আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী।
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী শাহজাহান সাজু বলেন, ‘নতুন প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে বেঞ্চ গঠন না হওয়ায় একরাম হত্যার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। নতুন করে বেঞ্চ গঠন করা হলে শুনানি শুরু হবে। তবে সেটি কবে শুরু হবে, সেটিও এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’
এদিকে আলোচিত এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামি এখনো গ্রেপ্তার এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের কয়েকজন বিদেশে চলে গেছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশসহ একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
যেসব আসামি পলাতক
মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে আত্মগোপনে আছেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ হোসেন, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর মামাতো ভাই আবিদুল ইসলাম আবিদ, আরমান হোসেন, চৌধুরী মো. নাফিজ উদ্দিন, জাহেদুল হাসেম, এমরান হোসেন, রাহাত মো. এরফান, জসিম উদ্দিন, একরাম হোসেন ওরফে আকরাম, শফিকুর রহমান, কফিল উদ্দিন মাহমুদ, মোসলে উদ্দিন, ইসমাইল হোসেন, মহিউদ্দিন আনিছ, মো. বাবলু ও টিটু। তাঁদের মধ্যে আটজন বিচার চলার সময় জামিনে মুক্ত হয়ে পালিয়ে যান। অপর আট আসামি শুরু থেকেই অধরা।
পলাতক আসামিদের বিষয়ে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজীম বলেন, একরাম হত্যাকাণ্ড আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ড। এ মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সব সময় সচেষ্ট রয়েছে। তাঁদের সন্ধান পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে। তবে বিভিন্ন সূত্রে পুলিশ অবগত হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন আসামি বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন। তাঁদের বিষয়েও গোয়েন্দা তৎপরতা রয়েছে।
‘ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দেশান্তরি পলাতক আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। রায় কার্যকরে বর্তমান সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে ন্যায়বিচার থমকে যাবে। একরামের তিন সন্তান এখন পড়াশোনা করছে। তারা যেন তাদের বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসির দেখতে পারে, সেই প্রত্যাশা আমাদের।’মোজাম্মেল হক, একরামুল হকের বড় ভাই।
কারাগারে আছেন যাঁরা
মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে কনডেম সেলে বন্দীদের মধ্যে আছেন হত্যার পরিকল্পনাকারী (মামলার রায়ে বলা হয়) জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ফেনী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী ওরফে সিফাত, আবু বক্কার সিদ্দিক, আজমির হোসেন রায়হান, শাহজালাল উদ্দিন, জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, কাজী শানান মাহমুদ, মীর হোসেন আরিফ, আরিফ, রাশেদুল ইসলাম, সোহান চৌধুরী, জসিম উদ্দিন, নিজাম উদ্দিন আবু, আবদুল কাইউম, নুর উদ্দিন মিয়া, তোতা মানিক, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, মো. সজীব, মামুন, রুবেল, হুমায়ুন ও টিপু। তাঁদের মধ্যে জিয়াউর রহমান বাপ্পিকে সর্বশেষ ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. আবদুল জলিল জানান, একরাম হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে সাতজন ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত গ্রেপ্তার অপর আসামিরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলা কারাগারসহ বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন।
একরাম হত্যার এক যুগ অতিবাহিত হলেও অজানা আতঙ্কে এখনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না তাঁর স্বজনেরা। পরিবারের একটি সূত্র জানায়, নিহত একরামের স্ত্রী ও তিন সন্তান ঘটনার পর থেকে রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছেন।
উচ্চ আদালতে বিচার আটকে যাওয়া এবং আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন একরামুল হকের বড় ভাই মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দেশান্তরি পলাতক আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। রায় কার্যকরে বর্তমান সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে ন্যায়বিচার থমকে যাবে। একরামের তিন সন্তান এখন পড়াশোনা করছে। তারা যেন তাদের বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসির দেখতে পারে, সেই প্রত্যাশা আমাদের।’