রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আবদুর রহিমের নিহত হওয়ার খবরে তাঁর ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা-ভাইসহ অন্য স্বজনেরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আবদুর রহিমের নিহত হওয়ার খবরে তাঁর ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা-ভাইসহ অন্য স্বজনেরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামে

‘ছেলে মরার পরে শুনলাম যুদ্ধে গেছিল, আগে জানলে রাশিয়া যাইতে দিতাম না’

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন আবদুর রহিম (৩০)। দালালের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত যোগ দেন দেশটির সেনাবাহিনীতে। ভালো বেতনের আশ্বাস দিয়ে তাঁকে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে পাঠানো হয়। পরিবারের দাবি, যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দিনই ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পর থেকে চলছে মাতম।

আবদুর রহিমের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামে। আজ বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের দুটি ভাঙাচোরা ঘরজুড়ে শোকাবহ পরিবেশ। একটি ঘর থেকে ভেসে আসছিল মায়ের আহাজারি। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, নতুন কাজে যোগ দেওয়ার পর এক মাস ধরে মা–বাবার সঙ্গে সরাসরি কথা হতো না রহিমের। তিনি নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা বলতেন। তবে দুই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল।

ছেলের মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা রমিছা খাতুন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে ওয়েল্ডিংয়ের কাজে গেছে। পরে এক দালাল তারে সেনাবাহিনীতে নিছে। আমরারে কইছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরি নিছে। সেনাবাহিনীতে গেছে—কয় নাই। মরার পরে শুনলাম যুদ্ধে গেছিল। আগে জানলে রাশিয়া যাইতে দিতাম না।’

আক্ষেপ নিয়ে বলে যাচ্ছিলেন রমিছা খাতুন, ‘বাবা কইছিল কষ্ট দূর করব, বাড়ি করব, তারপর বিয়া করব। ভালো বেতন দিব কইয়া দালাল আমার সর্বনাশ করছে। আমি দালালের বিচার চাই। আমার বাবার লাশ ফেরত চাই।’

আবদুর রহিম (৩০) আজিজুল হক ও রমিছা খাতুন দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে বড়। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ঋণ ও জমি বন্ধকের টাকায় সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সেখানে সাত বছর ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করেন। দেশে ফিরে কিছুদিন থাকার পর ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান। পরিবার জানত, সেখানেও তিনি ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছেন।

পরিবারের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার কিছুদিন পর রহিম অনিয়মিতভাবে টাকা পাঠাতে শুরু করেন। তিন মাস আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন চাকরির কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে আরও তিন লাখ টাকা নেন। পরে জানা যায়, তিনি রুশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে ছিলেন। এক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ১ মে কাজে যোগ দেন। পরদিন ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন।

আবদুর রহিম

রুশ সেনাবাহিনীতে একই ক্যাম্পে থাকা তাঁর বন্ধু লিমন দত্ত ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের তরুণ রিয়াদ রশিদের পরিবারের কাছে যোগাযোগ করেন। লিমন জানান, রিয়াদের সঙ্গে রহিমও নিহত হয়েছেন। পরে রিয়াদের পরিবার ও লিমন দত্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয় রহিমের পরিবার। নরসিংদীর বাসিন্দা লিমন দত্ত নিজেও ওই হামলায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

আবদুর রহিমের বাবা আজিজুল হক স্থানীয় একটি মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। আমরা জানি না, কী মনে কইরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিল। এক মাস ট্রেনিং কইরা যুদ্ধে যেই দিন গেল, সেই দিনই মারা গেছে শুনছি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি শুধু আমার ছেলের লাশ ফেরত চাই।’

ছোট ভাই আবদুর রহমান বলেন, ‘ভাই কইছিল, দুই মাস পরে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, আমাদের ভাগ্য খুলবে। নতুন কোম্পানিতে গেলে মাসে দুই লাখ টাকা বেতন দিবে বলছিল। গত মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকাও পাঠাইছিল। আমরা অবাক হইছিলাম। পরে বুঝলাম অন্য কিছু ঘটছে।’

আবদুর রহিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আজ মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর বাড়িতে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শহীদুল ইসলাম এবং ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান। এ সময় তাঁদের কাছে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনাসহ সরকারি সহায়তার দাবি জানান পরিবারের সদস্যরা।

কামরুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। মরদেহ দেশে আনার একটি প্রক্রিয়া আছে। পরিবারকে এ অনুযায়ী আবেদন করতে বলা হয়েছে। পরিবারটি বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত, আমরা সহযোগিতার চেষ্টা করব।’

দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে ইউএনও বলেন, মরদেহ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে। পাশাপাশি পরিবারটিকে মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে।