জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছিলেন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। পরে হাসনাত দুঃখ প্রকাশ করায় তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। এনসিপির সাংগঠনিক সভাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভার অনুমতি না মেলায় আজ শনিবার সন্ধ্যায় শহরের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা মঞ্চের সামনের খোলা মাঠে সভাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিকেল থেকেই সেখানে এনসিপির নেতা-কর্মীরা উপস্থিত হতে শুরু করেন।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, জেলা এনসিপি শিল্পকলা একাডেমিতে একটি সভা করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমিতে সাধারণত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়। এ কারণে সেখানে এনসিপির সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। এনসিপি পাশের মাঠে অনুষ্ঠান করছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারায় সরকারের সমালোচনা করেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার রাত পৌনে ১২টার দিকে জেলা শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলে বিক্ষোভকারীরা ‘বয়কট হাসনাত আবদুল্লাহ’, ‘বয়কট এনসিপি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাঁরা হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। দাবি মানা না হলে শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহত করারও ঘোষণা দেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আজ শনিবার বিকেল চারটায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সাংগঠনিক সমন্বয় সভার ঘোষণা দেয়। একই স্থানে বেলা তিনটায় কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত ও ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। একই স্থানে দুই পক্ষের কর্মসূচি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জেলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আজ বেলা দেড়টার দিকে নিজের ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি।’ পোস্টে তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ও সেখানকার আলেমদের ওপর মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় চাপানো হয়েছে এবং তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
এরপর বেলা দুইটার দিকে এনসিপির জেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা শহরের কান্দিপাড়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় যান। সেখানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে এনসিপির জেলা শাখার সদস্যসচিব আমিনুল ইসলামসহ অন্য নেতারা কুশল বিনিময় করেন।
জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্য আবদুল খালেক সাংবাদিকদের বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করায় তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। তাঁদের দাবি পূরণ হয়েছে বলে মনে করায় এনসিপির অনুষ্ঠানে আর কোনো বাধা নেই।
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য যুগ্ম সমন্বয়ক মোহাম্মদ আতাউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিস্থিতি নিয়ে যে উত্তেজনা ও ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিরসনে হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। এনসিপির আজকের অনুষ্ঠান যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলের আরও কয়েকজন নেতা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, শান্তি–শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
১৮ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে জেলা পুলিশের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ ঘটনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। পরে উভয় পক্ষকে নিয়ে সভা করে পরিস্থিতি শান্ত করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।