
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘যাদের অতীতেও খাসলত খারাপ ছিল, এখনো যারা লোভ সামলাতে পারেনি, সেই বিড়ালের হাতে গোশত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেবেন? এরা রাষ্ট্রের জনগণের জান, মাল এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা দেবে? এখনই দিচ্ছে না, তখন দেবে? আফসোস, তারাও মজলুম ছিলেন। কেন যে এখন বদলে গেলেন, বুঝতে পারলাম না। বিভিন্ন জায়গায় দখলদারি নিতে গিয়ে নিজেদেরই ২৩৪ জন শেষ, তারপর এখন আমাদের খুন করা শুরু হয়েছে, গালি দেওয়া শুরু হয়েছে।’
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির এ কথা বলেন। পরে রাজশাহীর ছয়টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁদের হাতে প্রতীক তুলে দেন তিনি। এর আগে তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিষালবাড়ি মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘পরিবর্তন ও নতুন বাংলাদেশের পক্ষে যুবক এবং মা-বোনদের উত্থান শুরু হয়েছে। এই দৃশ্য দেখে অনেকে নার্ভাস। মাঘ মাসেই এখন অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। তাঁরা চৈত্র মাসে কী করবেন? ঠান্ডা রাখেন, মাথা ঠান্ডা রাখেন। মাথা গরম করবেন না। রাজনীতি করতে হলে ঠান্ডা মাথায় আসেন। আপনি রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।’ তিনি বলেন, ‘হেরে যাওয়ার পূর্বাভাস শুরু হয়ে গেছে অলরেডি। পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা জানিয়ে দিয়েছে লাল কার্ড। আগামী ১২ তারিখে হবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লাল কার্ড। ফ্যাসিবাদ নতুন না পুরোনো, এটা বিবেচ্য ব্যাপার নয়। ফ্যাসিবাদ তোমাকে লাল কার্ড। তুমি যে অ্যাপ্রোন গায়ে দিয়ে আসো, তোমাকে লাল কার্ড।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘যারা চাঁদাবাজি করে না, যারা কাউকে কষ্ট দেয় না, যারা দুর্নীতি করে না, যারা মামলা–বাণিজ্য করে না, যারা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষকে হয়রান করে না; তাদের এখন বলা হচ্ছে জালেম। হায়রে আল্লাহ, এ কী দুনিয়ায় পড়লাম এসে! এদের বলব, চোখ মেলে দেখেন, জনগণ আপনাদের কীভাবে দেখে।’
ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন থেকে পাহারা বসাবেন। কোনো ভোট ডাকাত, ভোট চোর, ভোট ইঞ্জিনিয়ার—কাউকে এবার কোনো ছাড় নেই। সিনা মজবুত করে হাত শক্ত করে আমাদের দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আমরা ইনশা আল্লাহ পারব, আমাদের পারতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করার জন্য আপনারা এখন থেকে পাহারা বসাবেন।’
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা এই জাতিকে আর বিভক্ত করতে দেব না। আমরা ঐক্যবদ্ধ একটা জাতিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। এ জন্য আমাদের ১১ দলের স্লোগান হচ্ছে, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আমাদের কথা সাফ। আমরা আল্লাহর দরবারে ওয়াদাবদ্ধ। জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ। জনগণের রায়ের মাধ্যমে আল্লাহ যদি এই দেশ পরিচালনার সুযোগ আমাদের দেন; আমরা ইনশা আল্লাহ কাউকে আর চাঁদাবাজি করতে দেব না। এই দেশে কারও দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না। রাজার ছেলে রাজা হবে—বংশানুক্রমে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি এই দেশে আর চলবে না। এই দেশে রাজনীতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘এই দেশে রাজনীতি হবে দেশপ্রেমের প্রমাণের মাধ্যমে। এই দেশে কোনো আধিপত্যবাদী রাজনীতি আর চলবে না। হ্যাঁ, আমাদের প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকবে। সেই সম্পর্ক হবে সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে। অমর্যাদাকর কোনো সম্পর্ক আমরা কোনো দেশের সঙ্গে চাই না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। এ জন্য আমাদের সোনার ছেলেরা সেদিন গুলিতে পরোয়া করে নাই। তারা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।’
স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘শিশু জন্ম নেওয়ার পরে তার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের পরিচর্যার দায়িত্ব নেবে সরকার; পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা খরচে শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। আর যাঁরা অবসরজীবনে চলে যাবেন, তাঁদেরও চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে সরকার এবং রাষ্ট্র, সেটাও বিনা পয়সায় ইনশা আল্লাহ। মাঝখানে পার্টিসিপেটরি কিছু আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আর কিছু সরকারের। এভাবে আমরা একটা মানসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলব। প্রতিটি বিভাগীয় নগরী ও জেলায় আমরা মেডিক্যাল কলেজ কায়েম করব এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলব। শ্রমিকদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘রাজশাহীর কিছু সমস্যা আছে। থাকবে, সব জায়গায় সমস্যা আছে; যেহেতু ইনসাফ কায়েম নাই; যেহেতু দেশকে নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কমিটমেন্ট নাই। এখানে একটা মেডিক্যাল কলেজ আছে, বহু পুরোনো। তার সঙ্গে একটা ডেন্টাল ইউনিট করা হয়েছে, ডেন্টাল কলেজ করা দরকার। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর কয়টা দিন তো, সবুর করুন। যদি আপনাদের পছন্দের লোকদের দায়িত্ব দেন, আপনাদের কিছু করতে হবে না। আমরাই খুঁজে খুঁজে সব বের করব, জাতিকে সেবা দেওয়ার জন্য। আপনাদের ডেন্টাল কলেজকে আমরা টান দিয়ে জাগিয়ে তুলে দেব।’
‘১১ দলে কোনো ব্যাংক ডাকাত, চাঁদাবাজ নেই’
গোদাগাড়ীর জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা নিজেরা দুর্নীতি করব না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয়ও দেব না। সবার জন্য ন্যায়বিচার হবে। এখানে কেউ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। জুলাই সনদ এবং সংস্কারের সমস্ত প্রস্তাব মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়নের ওয়াদা করতে হবে। এই তিন শর্তে যারা একমত হয়েছে, তারা আমরা ১১ দলে একত্র হয়েছি। আমাদের ১১ দলের প্রার্থীদের মধ্যে কোনো ব্যাংক ডাকাত নাই। চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি, মামলাবাজ, নারী নির্যাতনকারী, মানুষের অধিকার হরণকারী নাই। আমরা বেছে বেছে গুনে গুনে চেষ্টা করেছি। আমরা আগামীতে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি জাতির বাঁক পরিবর্তন এবং জাতিকে সঠিক পথে ওঠানোর নির্বাচন। বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা এই নির্বাচন পেয়েছি। যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে চব্বিশ এনে দিয়েছিল আমাদের, তাদের অনেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাই আমরা ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমরা সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার চাই। এই বাংলাদেশ হবে নতুন বাংলাদেশ।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশে শিশু-বৃদ্ধ-আবাল-বনিতা সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যে বাংলাদেশে আমার মায়েরা ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে নিরাপদ থাকবে, সমাজ তাঁদের মর্যাদা দেবে, সেই বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি। আমরা সেই শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেই শিক্ষাব্যবস্থা লড়াকু একজন সৈনিক তৈরি করবে, যে দেশটাকে গড়ে দেবে। আমাদের যুবকেরা কারও কাছে বেকারভাতা চায় না। আমরা ওয়াদাবদ্ধ। আমরা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পাল্টে দেব।’
বিচারব্যবস্থা নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘এমন বিচারব্যবস্থা আমরা চাই, যে বিচারে একজন সাধারণ মানুষের কোনো অপরাধ করলে যে শাস্তি হবে; দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি যদি একই অপরাধ করে; বিচার তাকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না। একই শাস্তির আওতায় তাকে আনা হবে। আনতে বাধ্য করা হবে। ন্যায়বিচার যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, জনগণ সকল ক্ষেত্রে তাদের অধিকার পেয়ে যাবে।’