পানিতে তলিয়ে থাকা ধান তুলতে বেরিয়েছেন কৃষক নোমান মিয়া। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের হিংছালিতে
পানিতে তলিয়ে থাকা ধান তুলতে বেরিয়েছেন কৃষক নোমান মিয়া। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের হিংছালিতে

হাওরে কৃষকের হাহাকার

‘ক্ষতির জ্বালা তুলিয়া লাভ নাই, খেতে আর পুতে হমান’

কাঁধে ধানের আঁটি বহনের ‘হুজা’। তাতে ঝোলানো ছাতা, টিফিন বক্সে দুপুরের খাবার। হাতে ঝোলানো ছাতা ও একটি ব্যাগে সারা দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ঝলমলে রোদে কাদামাটির রাস্তা ধরে আরও অনেকের সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন নোমান মিয়া (৬৫)। তাঁর পোড় খাওয়া চোখের সামনে তখন কাউয়াদীঘি হাওরের থই থই পানি। পানিতে ডুবে আছে পাকা ধান। সেই ধান তোলার এখন সুযোগ কম। তবু যতটা তুলতে পারা যায়, সেই চেষ্টা করতেই বেরিয়েছেন নোমান মিয়া।

ধানখেতের প্রসঙ্গ তুলতেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। নোমান মিয়া বলেন, ‘পানির আগে এক কিয়ার (৩০ শতক) জমির ধান কাটতাম পারছি। আর সব পানির নিচে। পানি থাকি তুলবার অবস্থা নাই। তারপরও কিতা করমু, কায়ার মায়ায় বন্দী। মায়ায় দেয় না ধান ফালাইয়া আইতাম। ছেলের জন্য যে মায়া, ধানর লাগিও একই মায়া।’ হাওরের বুকে দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘ক্ষতির জ্বালা তুলিয়া লাভ নাই, খেতে আর পুতে (সন্তান) হমান (সমান)। পুতদি যে মায়া, আমরার খেতদি একই মায়া।’

নোমান মিয়ার বাড়ি মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা পাঁচগাঁও ইউনিয়নের কাউয়াদীঘি হাওরপারের রক্তা গ্রামে। বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে কাউয়াদীঘি হাওরের উলাউলি ও কুশুয়ার এলাকায় ১৬ কিয়ার জমিতে এ বছর বোরো আবাদ করেছিলেন। নিজের জমি না থাকায় অন্যের জমি চাষ করেন তিনি। নোমান মিয়া বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থাকিই আমরা বোরো খেতনির্ভর। আর কোনো খেত নাই। এই খেতর ওপর নির্ভর করি খানিবনি (খাওয়াদাওয়া), কাপড়-লতা সবকিছু।’

পানির নিচের ধান তুলতে নৌকা নিয়ে হাওরে ছুটছেন অনেকে। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের হিংছালিতে

জমির মালিককে প্রতি কিয়ারে এক থেকে দুই মণ ধান দেওয়ার শর্তে ‘চুক্তি ভাগি’ নিয়ে জমি চাষ করেন নোমান মিয়া। তাঁর অন্য কোনো আয়ের উৎস নেই। পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে আছে। খেতের আয় দিয়েই পরিবারের ভরণপোষণসহ যাবতীয় খরচ চলে। খেত তলিয়ে যাওয়ায় তিনি অথই সাগরে পড়েছেন। কীভাবে সারা বছর চলবে—তিনি অনুমানও করতে পারছেন না।

বুধবার সকালে কাউয়াদীঘি হাওরপারের হিংছালি এলাকায় নোমান মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। পথের পাশ দিয়ে হাওরে গিয়ে মিশেছে আখালি গাঙ (নদী)। অনেকে খালি নৌকা নিয়ে আখালি দিয়ে হাওরের দিকে ধান তুলতে ছুটছেন। আবার কেউ পানি বেড়ে যাওয়ায় ধান না তুলেই ফিরে আসছেন। দু-একটি নৌকায় এখনো ডোবেনি, এমন খেত থেকে ধান কেটে অনেকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।

নোমান মিয়া জানান, এবার ধান মোটামুটি ভালো হয়েছিল। এক কিয়ারে কম করেও ১৫ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়া যেত। বছরটা ভালোভাবে কাটবে, এমন আশাতেই ছিলেন। এক কিয়ারে তাঁর নিজের পরিশ্রম বাদে রোপণ, হাল চাষসহ আনুষঙ্গিক খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। এই জমি চাষ করতে গিয়ে তাঁর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেনা হয়েছে। এখন পানির নিচ থেকে ধান কাটাতে গিয়ে ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু ধান তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

আখালি গাঙের পাড়ে রাখা ধানের আঁটি পচে অঙ্কুর গজিয়েছে। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারে

নোমান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব খেত ডুবছে, আমরা সর্বস্বান্ত। অখন বুকপানি থাকি ধান তুলরাম। কিছু সময় পানিত ডুবদি ধান তুলি, ঠান্ডা লাগলে উঠি। পান-সিগারেট খাই। আবার ডুব দিয়া তুলি। মনে করলাম, ১২ মাসের খানি তুলতাম আছলাম, না অয় ছয় মাসর তুলতাম। তবু পারমু কি না বুঝরাম না। বৃষ্টি দিলে তো আর সম্ভব অইত নায়। নিজর খেতর ভাত খাইতাম করি অত কষ্ট কররাম।’

এই কৃষক জানান, পানির নিচ থেকে যে ধান তুলছেন, তারও সবটা ভালো নেই। অনেক ধানে অঙ্কুর ফুটে গেছে। এগুলো আর কোনো কাজে লাগবে না। ফেলে দিতে হচ্ছে। আখালির পাড়ে অনেকগুলো ধানের আঁটি। এক চাচাতো ভাইয়ের স্তূপ করে রাখা ধানের আঁটি খুলে দেখালেন শুকাতে না পারায় তাতে অঙ্কুর বেরিয়ে গেছে। এ রকম অনেকের ধানেই অঙ্কুর বেরিয়েছে।

নোমান মিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় আরও অনেকে এসে ভিড় করেন। প্রায় সবাই বলেন, ‘আমার নামটা লেখইন।’ তাঁদের কেউ হাওরে যাচ্ছেন পানি থেকে ধান তুলতে, কেউ পানি দেখে পথেই বসে পড়েছেন—আর হাওরে যাচ্ছেন না। কেউ ধান তুলতে না পেরে হাওর থেকে বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছেন। সবারই একই হাহাকার, ‘এবার ধান নাই। সব ডুবি গেছে। মানুষ অসহায়।’ কৃষকেরা জানালেন, অনেকে ৫০ থেকে ৮০ কিয়ার জমিতে ধান করেছেন। এক মুঠ ধানও কাটতে পারেননি। খেতের পাকা ধানের ওপর এখন বুকসমান পানি ঢেউ খেলছে।

পানির নিচের ধান তুলতে নৌকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন আকদ্দছ আলী। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছেন। বুধবার সকালে কাউয়াদীঘি হাওরপারের হিংছালিতে

ধীরে ধীরে বেলা বাড়ছে, নোমান মিয়ার পায়েও হাওরে এগিয়ে যাওয়ার তাড়া। কথা বলতে বলতে একসময় হাওরের পানিতে নৌকার কাছে চলে যান। এটাও ভাড়ার নৌকা। এলাকায় একটি নৌকার ভাড়া এখন ৫০০ থেকে হাজার টাকা। রোদ থাকলেও তখন আকাশে মেঘ ভাসতে শুরু করেছে। মেঘের ছায়া পড়ছে হাওরের জলে। নোমান মিয়া বলেন, ‘রক্তা গ্রামও এমন কুনু ফ্যামিলি নাই, যে দুই-চাইর কিয়ার খেত করছে না। সবারই একই অবস্থা।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে আমাদের জরিপের কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত জেলার হাওরাঞ্চলে পানিতে তলিয়ে ৩ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। জরিপ শেষ হলে চূড়ান্ত ক্ষতিটা জানা যাবে।’