কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে সড়কজুড়ে মিশুক-ইজিবাইক। গত বুধবার বিকেলে তোলা
কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে সড়কজুড়ে মিশুক-ইজিবাইক। গত বুধবার বিকেলে তোলা

অটোরিকশার দাপটে কুমিল্লা শহর স্থবির

ট্রাফিক পুলিশের হিসাবে কুমিল্লা শহরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার মিশুক ও ইজিবাইক চলাচল করছে।

কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় থেকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো মোটরযানে এই পথ পাড়ি দিতে ১৫ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ‘দাপটে’ এই দূরত্ব অতিক্রম করতে এখন পৌনে এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। শুধু প্রধান সড়ক নয়, অলিগলির সড়কেও এখন যানজট হচ্ছে।

কান্দিরপাড় থেকে শহরের যেকোনো দিকে একটু গেলেই যানজটে পড়তে হয়। সকাল ৯টা–১০টা থেকে রাত ১০টা–১১টা পর্যন্ত শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানজট লেগেই থাকে। এর বড় কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং বেপরোয়া চলাচল।

কুমিল্লা ইবনে তাইমিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেনের বাসা শহরের ঠাকুরপাড়া এলাকায়। তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান মা রোজিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘মিশুকে ২০ টাকার ভাড়া অনেক সময় ৫০ টাকা দিয়াও যাওন লাগে। বাসা থাইক্যা স্কুলে যাইতে ৫-১০ মিনিট লাগনের কথা। কিন্তু অটো এই পরিমাণে বাড়ছে যে আধা ঘণ্টায় যাওয়াও কষ্টকর। অবস্থা দেইখ্যা মনে হইতাছে শহরের রাস্তার থাইক্যা অটোর পরিমাণ বেশি।’

কুমিল্লা শহরের এসব অটোরিকশা বা মিশুক নিয়ন্ত্রণে আনতে সব প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। পাঁচ হাজার মিশুক আর দুই হাজার ইজিবাইকের অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যে আবেদন গ্রহণ শেষ হয়েছে।
মো. ইউসুফ মোল্লা, প্রশাসক, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন

২০২৩ সালের জুনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, পাঁচ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা মিশুক এবং এক হাজার পায়ে চালিত রিকশার নিবন্ধন দেওয়া হবে। তখন সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখন সিটি করপোরেশন বলছে, সাত হাজার অটোরিকশা অনুমোদন দেওয়া হবে। এর মধ্যে থাকবে পাঁচ হাজার মিশুক ও দুই হাজার ইজিবাইক। ছয় আসনের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ইজিবাইক নামে পরিচিত।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক সারোয়ার পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, শহরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার মিশুক ও ইজিবাইক চলাচল করছে। এ কারণে শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

শহরে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালের ৩০ মে সার্কিট হাউসের সামনে দ্রুতগতিতে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এসে ধাক্কা দেয় সাংবাদিক আনোয়ার হোসাইনকে। এতে তাঁর বাঁ পা ভেঙে যায়। তিনি এখনো স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন না। গতকাল রাতে আনোয়ার হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কুমিল্লা নগরের মানুষের জন্য অভিশাপ। এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। আমার সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। কুমিল্লা শহরে বেপরোয়া অটোর কারণে বহু মানুষ এমন ঘটনার ভুক্তভোগী।’

কুমিল্লা শহরের এসব অটোরিকশা বা মিশুক নিয়ন্ত্রণে আনতে সব প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে বলে জানান সিটি প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ হাজার মিশুক আর দুই হাজার ইজিবাইকের অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যে আবেদন গ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। অনুমোদিত অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট পোশাক ও পরিচয়পত্র থাকবে। অনুমোদনহীন অটোরিকশা নগরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

সংকেত থাকলে পুলিশ আটকায় না

গত বুধবার বিকেলে এক ঘণ্টা কান্দিরপাড় এলাকায় অবস্থান করে কয়েকটি মিশুকের গায়ে বিশেষ ধরনের লেখা বা সংখ্যা চোখে পড়ে এ প্রতিবেদকের। কোনো অটোরিকশায় লেখা ‘হাবিব ঢুলিপাড়া-১২ ’, কোনোটি ‘জাহিদ-১৩ ’, ‘রাফি ট্রেডার্স-১১ শুভপুর’, ‘ইমু পরিবহন-বি-০৪’ ইত্যাদি। আবার কোনো কোনো মিশুকে শুধু একটি সংখ্যা লেখা।

অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব লেখা বা সংখ্যা দিয়ে অটোরিকশাটি কোন গ্যারেজের তা চিহ্নিত করা হয়। ওই সংখ্যা লেখা থাকলে পুলিশ অটোরিকশা আটকায় না। এর সঙ্গে নিয়মিত ‘মান্থলি’ বা মাসিক টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

পাঁচ বছর ধরে শহরে মিশুক চালান মতিউর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে আমরার থাইক্যা ট্রাফিক পুলিশে নিজেরা টোকেন দিয়া টাকা তুলত। ৫০০ টাকা দিয়া টোকেন না নিলে অটো আটকাইয়া রাখত। পরে ছাড়াইয়া আনতে ২ থাইক্যা ৩ হাজার টাকা লাগত। আওয়ামী লীগ পালাইয়া যাওনের পরে পুলিশে সরাসরি টাকা লয় না। এহন গ্যারেজগুলা থাইক্যা মান্থলি কন্ট্রোল হয়। প্রতিটা এলাকায় এহন লোক আছে। যেই সব গাড়ির গায়ে সংকেত নাই, হেইডিরে পুলিশ আটকায়।’

আরও তিনজন মিশুকচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন মিশুকের ক্ষেত্রে মাসে প্রায় ৫০০ টাকা এবং পুরোনো মিশুকের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। তবে এসব টাকা কারা নেয় বা শেষ পর্যন্ত কার কাছে যায়, সে বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।

তবে অটোরিকশা থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক সারোয়ার পারভেজ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতীতে ট্রাফিক পুলিশ টোকেন দিয়ে কখনোই টাকা উত্তোলন করেনি। বর্তমানেও এমন কোনো কর্মকাণ্ড হয় না।’