তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ‍্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ‍্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখবে তারা। দোকান খোলা থাকলেও নেই বোতলে গ্যাস। ক্রেতা এসে ফেরত চলে যাচ্ছে। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর এলাকায়
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ‍্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ‍্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখবে তারা। দোকান খোলা থাকলেও নেই বোতলে গ্যাস। ক্রেতা এসে ফেরত চলে যাচ্ছে। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর এলাকায়

দোকানে দোকানে ঘুরেও মিলছে না গ্যাস সিলিন্ডার, চট্টগ্রামে চুলা জ্বলেনি অনেক বাড়িতে

চট্টগ্রাম নগরের আতুরার ডিপো এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের রান্নাঘরের চুলা তিন দিন ধরে জ্বলছে না। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে তাঁর দৌড়ঝাঁপ। বাসার আশপাশের দোকান ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিয়েছেন, কিন্তু কোথাও সিলিন্ডারের দেখা পাননি।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে সাইদুল ইসলামকে পাওয়া যায় নগরের ষোলশহর এলাকার একটি এলপিজি বিক্রির দোকানে। সিলিন্ডার কেনার আশায় এসেছিলেন, কিন্তু এসে জানতে পারেন, বিক্রিই বন্ধ। হতাশ সাইদুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন দিন ধরে বাসার আশপাশের সব দোকানে খুঁজেছি। কোথাও গ্যাস নেই। বাড়তি দাম দিলেও বিক্রি করছে না। আজ তিন কিলোমিটার দূরে এসেও একই অবস্থা।’

এই সংকট সাইদুলের পরিবারের জন্য কেবল ভোগান্তির নয়, বড় দুশ্চিন্তারও। বাসায় অসুস্থ সন্তান রয়েছে। গরম পানির দরকার হয় নিয়মিত। বাসি খাবার খাওয়ানো যায় না। সাইদুল বলেন, ‘এভাবে রান্না বন্ধ হয়ে যাবে, তা ভাবিনি। নয়তো আগেই সিলিন্ডার কিনে রাখতাম।’

ষোলশহর এলাকার এলপিজি বিক্রির প্রতিষ্ঠান সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মোহাম্মদ সোহেল জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে পরিবেশকেরা সিলিন্ডার সরবরাহ করতে পারছেন না। প্রতিদিন ক্রেতারা খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে ভিড় করছেন। কিন্তু আমাদের হাতে দেওয়ার মতো কিছুই নেই।

শুধু সাইদুল নন, নগরের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। কোথাও সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রাহকেরা। সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করা খাবারের দোকানেও রান্না হচ্ছে না। মূলত আজ সকাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন মূল্য সমন্বয়, প্রশাসনের মাধ্যমে পরিবেশকদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধসহ কয়েকটি দাবিতে এ কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মানা না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ থাকবে।

দোকানে এসে গ্যাস কিনতে না পেরে হতাশ এই ক্রেতা। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর এলাকায়

এর আগে গতকাল বুধবার সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান জানান ব্যবসায়ীরা। রাতে সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিক্রি বন্ধ থাকবে। আজ বিকেলে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সমাধান এলে বিক্রি আবার শুরু হবে, না হলে বন্ধই থাকবে।

উল্লেখ্য, প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতির অভিযোগ, পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সংকট নিরসনের বদলে দাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। ভোক্তা অধিকারের অভিযান বাজারে আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার ফলে অনেক ব্যবসায়ী কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

খালি হাতে ফিরছেন ক্রেতারা

হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ তামিমের বাসায় গতকাল হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এর পর থেকে পরিবারের সবাই হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। আজ দুই নম্বর গেট এলাকায় সিলিন্ডার খুঁজতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের খোঁজে ৫০০ টাকা গাড়িভাড়া খরচ হয়ে গেছে। তবু কোথাও নেই। কবে পাওয়া যাবে, কেউ জানে না। আগ্রাবাদ এলাকার মোহাম্মদ আইয়ুবের অভিযোগ, বড় কোম্পানিগুলো গ্যাস দিচ্ছে না। একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোক্তাদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই।

এলপিজি–সংকটের সরাসরি আঘাত পড়েছে নগরের ছোট-বড় খাবারের দোকানেও। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান—অনেকেরই রান্নার প্রধান ভরসা এলপিজি। কিন্তু সিলিন্ডার না পাওয়ায় অনেক দোকানে চুলা জ্বলছে না, কোথাও আবার সীমিত মেনুতে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। চকবাজার ও দুই নম্বর গেট এলাকার কয়েকজন খাবার বিক্রেতা জানান, প্রতিদিনের বিক্রির বড় অংশ কমে গেছে। কেউ কেউ দোকান আগেভাগেই বন্ধ করে দিচ্ছেন, কারণ বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা নেই।

বিক্রেতারা কী বলছেন

নগরের ষোলশহর, দুই নম্বর গেট, চকবাজার ও আতুরার ডিপো এলাকার অন্তত ১০টি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না। দোকানিরা বলছেন, পরিবেশকেরা গ্যাস দিচ্ছেন না।

দুই নম্বর গেট এলাকার মেসার্স মোহাম্মদিয়া ট্রেডিংয়ের মালিক মুহাম্মদ আলী আজম জানান, এলপিজি আমদানি কমে যাওয়ার কথা বলে পরিবেশকেরা সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে সংকট চলছে। পরিবেশকেরা বলছেন, মাসের শেষ দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। খুচরা বিক্রেতা দীপক বিশ্বাস বলেন, দোকানভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি ওঠানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রি করব কীভাবে। একজন পরিবেশক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, কোম্পানি থেকেই তাঁরা সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।

এলপিজির এই সংকট কৃত্রিম বলে মন্তব্য করেছেন ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে আমদানির সংকট নেই। আমদানি খরচও কম। তবু কৃত্রিমভাবে সংকটের সৃষ্টি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে চরম দুর্ভোগে পোহাচ্ছেন ক্রেতারা। সরকারকে অবশ্যই দ্রুত এই সংকটের সমাধান করতে হবে।