
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া গ্রামের আবহটা অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ কিছুটা ভিন্ন। গ্রামটি যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে। কারণ, রাজধানীর উত্তরায় আবাসিক ভবনে আগুন লেগে যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের মধ্যে তিনজনই চৌদ্দগ্রামের চিওড়া গ্রামের কাজী বাড়ির। স্বামী–স্ত্রী ও তাঁদের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে স্বজনদের সঙ্গে পুরো গ্রামই যেন কাঁদছে।
আজ শনিবার সকালে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বেলা ১১টায় চিওড়া কাজী বাড়িতে তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় একই পরিবারের তিনজনকে। এক পাশে স্বামী কাজী ফজলে রাব্বি (৩৮), মাঝে স্ত্রী আফরোজা আক্তার (৩৭) ও আরেক পাশে তাঁদের আড়াই বছরের সন্তান কাজী ফাইয়াজ রিশানকে দাফন করা হয়।
ফজলে রাব্বি চিওড়া কাজী বাড়ির কাজী খোরশেদ আলমের একমাত্র ছেলে। রাব্বির মা ফেরদৌস আরা বেগম কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছেন। একমাত্র ছেলে, ছেলের বউ ও নাতিকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় তাঁরা। কোনো সান্ত্বনায় তাঁদের কান্না থামছে না।
স্বজনেরা জানান, ফেরদৌস আরা বেগমের এক ছেলে ও এক মেয়ে। নগরের নানুয়াদিঘির পশ্চিমপাড়ে তাঁদের নিজস্ব বাসা। এখানেই কাজী ফজলে রাব্বির বেড়ে ওঠা। তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুলের এসএসসি ২০০৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। চাকরির কারণে স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটিসহ প্রায়ই ছুটি পেলে কুমিল্লায় ছুটে আসতেন। ফজলে রাব্বি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কাজ করতেন। তাঁর স্ত্রী আফরোজা কাজ করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে আটটার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে আগুন লাগে, সেই বাড়ির পঞ্চম তলায় স্ত্রী–সন্তান নিয়ে থাকতেন ফজলে রাব্বি।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, প্রথমে ভবনের দোতলায় আগুন লাগে। দ্রুত আগুন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তৃতীয় তলায়ও আগুন ধরে যায়। এই দুই তলার বাসিন্দারা বেঁচে গেছেন। কিন্তু আগুনের ধোঁয়া ওপরের দিকে ওঠে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছয়জন প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
ফজলে রাব্বির চাচা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী ফখরুল আলম বলেন, এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। পুরো গ্রামই শোকে স্তব্ধ। ঢাকায় জানাজা শেষে তিনজনের মরদেহ গতকাল রাতেই কুমিল্লা নগরের বাসায় নিয়ে আসা হয়। রাত ১০টায় নগরের দারোগা বাড়ি জামে মসজিদে তাঁদের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ সকালে চিওড়া গ্রামের বাড়িতে তৃতীয় জানাজা শেষে তাঁদের চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
ফখরুল আলম আরও বলেন, ‘ফজলে রাব্বি বাবা–মায়ের একমাত্র ছেলে। ছেলেটার পুরো পরিবারই শেষ হয়ে গেল। কীভাবে সান্ত্বনা দিয়ে তাঁদের শান্ত করব, আমরাও ভেবে কূল পাচ্ছি না। মুহূর্তের মধ্যেই সাজানো একটি পরিবার শেষ হয়ে গেল। ছেলেটা খুবই ভালো ছিল।’
ফজলে রাব্বির নিকটাত্মীয় কাজী নাহিদ জানান, ‘তাঁদের সংসার অনেক সুখের ছিল। কিন্তু সুখ বেশি দিন সইল না। আজ স্বামী–স্ত্রী ও সন্তানের লাশের অ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে এল। ভাবতে খুব খারাপ লাগছে। এভাবে একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যু হবে, আমরা কখনো কল্পনা করতে পারছি না।’
বাবা সত্তরোর্ধ্ব খোরশেদ আলম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমরা এখন কী নিয়ে বাঁচব। ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল। রাব্বি আমার একমাত্র ছেলে। এক মেয়ে আছে, তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে। নাতিটার মুখে আর দাদা ডাক শুনতে পারলাম না। আমাদের তো সবই শেষ হয়ে গেল। এমন মৃত্যু কীভাবে মেনে নেব?’