স্ত্রী নূরজাহান বেগমকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সাজু শেখ। গত বুধবার বিকেলে শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামে
স্ত্রী নূরজাহান বেগমকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সাজু শেখ। গত বুধবার বিকেলে শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামে

৭০ বছরের সংসারে অভাবের হানা, শয্যাশায়ী স্ত্রীকে কোলে নিয়ে কাঁদলেন সাজু

ঘরের দরজার সামনে স্ত্রী নূরজাহান বেগমকে (৮২) পাঁজাকোলা করে দাঁড়িয়ে আছেন সাজু শেখ (৮৮। বয়সের ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছেন না। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। কাঁপা কণ্ঠে আল্লাহর কাছে খাবার চাইছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনও নির্বিকার।

ঘটনাটি ৯ সেপ্টেম্বর শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের। স্থানীয় এক ব্যক্তি মুঠোফোনে ঘটনার ভিডিও করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নজরে আসে অনেকের। অসহায় দম্পতিকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

ছোট্ট একটি ঘরে প্রায় ৭০ বছর ধরে সংসার সাজু ও নূরজাহানের। এই দীর্ঘ জীবনে অভাব তাঁদের নিত্যসঙ্গী। বয়সের ভারে দুজনই এখন ন্যুব্জ। এর মধ্যে প্রায় ছয় বছর ধরে শয্যাশায়ী নূরজাহান। তাঁকে দেখাশোনা করতে গিয়ে সাজুও অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। খাবারের অনিশ্চয়তা আর চিকিৎসার অভাবের মধ্যেও দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বৃদ্ধ দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। তাঁরা মাঝেমধ্যে মা-বাবার খোঁজ নেন। তিন ছেলের একজন করোনা মহামারির সময় নিখোঁজ হন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান। বছরে এক-দুবার বাড়িতে আসেন। শেরপুরে থাকা ছোট ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি করেন, ঠেলাগাড়িও চালান। কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাঁর তিন মেয়ে। নিজের সংসার চালাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল করতে পারেন না।

প্রায় ছয় বছর আগে পা পিছলে পড়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এরপর থেকেই বিছানায় পড়ে আছেন তিনি। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি সাজু। স্ত্রীকে একা রেখে কোথাও যেতেও চান না। প্রতিদিন সকালে স্ত্রীকে কোলে করে ঘরের বাইরে উঠানে নিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ তাঁর পাশে বসে থাকেন। কানে কম শোনেন নূরজাহান। তবু স্ত্রীর ইশারা বোঝার চেষ্টা করেন সাজু, প্রয়োজনীয় কাজগুলোও করে দেন।

শেরপুরের বৃদ্ধ দম্পতি সাজু শেখ ও নূরজাহানের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য সহায়তা তুলে দেন জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। সোমবার দুপুরে শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামে

একসময় ব্যবসা করতেন সাজু। সেই আয়েই চলত সংসার। এখন বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না। মাঝেমধ্যে কাজের আশায় বাজারে গেলেও দুর্বল শরীর দেখে কেউ কাজ দিতে চান না।

সাজু ও নূরজাহানকে নিয়ে করা ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিক তাঁদের বাড়িতে যান। তাঁরা ওই দম্পতির খোঁজখবর নেন। তাঁদের খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, কম্বল ও অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। প্রতি মাসে খাবারের জন্য সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সামাজিক সংগঠন ‘রক্তসৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ ওই দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আল আমিন বলেন, বিষয়টি জানার পর সংগঠনটি ওই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেড় মাসের খাবারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

শেরপুর সদর উপজেলার ইউএনও আসমা বিনতে রফিক জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ৯ সেপ্টেম্বরই ওই পরিবারে খাদ্যসামগ্রী, কাপড় ও অর্থ দেওয়া হয়েছে।

ওই বৃদ্ধ দম্পতি বয়স্ক ভাতা পান উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে ইউএনওকে সহযোগিতার জন্য পাঠিয়েছিলেন। সোমবার পরিবারটির খোঁজখবর নিতে ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন। তাঁদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবারটির প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।