রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে সতর্ক পাহারায় শফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি তারাগঞ্জ উপজেলার খিয়ারজুম্মা এলাকায়
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে সতর্ক পাহারায় শফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি তারাগঞ্জ উপজেলার খিয়ারজুম্মা এলাকায়

এক দুর্ঘটনাই বদলে দিল শফিকুলকে

সকাল আটটা বাজলেই হাতে বাঁশি নিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে যান শফিকুল ইসলাম ওরফে শফি। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে—হাতের ইশারায় থামান যানবাহন। ছোট শিক্ষার্থীদের হাত ধরে রাস্তা পার করে দেন। বয়স্ক মানুষ দেখলে ছুটে যান তাঁদের পাশে। কোনো চালককে আবার ধীরে চলার সংকেত দেন। এভাবেই সকাল গড়িয়ে রাত হয়। কখনো রাত ১০টা পর্যন্তও মহাসড়কে দেখা যায় তাঁকে।

শফিকুল ইসলাম ট্রাফিক পুলিশ নন। সরকারি চাকরিও করেন না। মাস শেষে বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। তবুও প্রায় এক বছর ধরে নিজের তাগিদে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার খিয়ারজুম্মা এলাকায় রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ‘ট্রাফিক শফি’ নামে পরিচিত।

স্থানীয় আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, শফিকুল ভাই টাকা-পয়সার কথা চিন্তা না করে আন্তরিকভাবে মানুষের জন্য কাজ করছেন। অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেল, অন্য যানবাহনকেও সতর্কভাবে চলাচলে তিনি সহায়তা করেন। তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খিয়ারজুম্মা বাসস্ট্যান্ডটি চারমুখী। মহাসড়কের পাশাপাশি এখান থেকে দুটি আঞ্চলিক সড়ক গেছে দুই দিকে। অটোরিকশা, থ্রি–হুইলারসহ নানা যানবাহনের চলাচল ও যাত্রী ওঠানামায় জায়গাটি প্রায়ই ব্যস্ত থাকে। এমন ব্যস্ততার মধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৩ সালে জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এই বাসস্ট্যান্ডে পৃথক সাতটি দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও চারজন আহত হন। ওই বাসস্ট্যান্ডের ১০০ গজ পাশেই শফিকুলের বাড়ি।

রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে এক বৃদ্ধাকে রাস্তা পারাপারে সহায়তা করছেন শফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি তারাগঞ্জের খিয়ারজুম্মা এলাকায়

শফিকুল বলেন, ২০২৫ সালে ৯ জুলাই ওই স্থানে ট্রাকের ধাক্কায় একজন মোটরসাইকেলের আরোহী তাঁর চোখের সামনে মারা যান। সেই দৃশ্য তাঁকে নাড়া দেয়। এরপর বাড়ির কাজ ফেলে তিনি নিজেই সড়কে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মানুষের রাস্তা পারাপারে সাহায্য করি। নিজের পেটে ক্ষুধা থাকলেও এই কাজ ভালো লাগে।

শফিকুল পারিবারিকভাবে সচ্ছল নন। ছয় সন্তানের বাবা তিনি। পাঁচ সন্তান বিয়ে করেছেন। এক ছেলে এখনো অবিবাহিত। এক ছেলে ভ্যান চালান। সংসারে অভাব থাকলেও দিনের বড় একটি অংশ অন্যের নিরাপত্তায় ব্যয় করেন তিনি। দুপুরে সামান্য সময়ের জন্য বাড়িতে যান তিনি। ভাত খেয়েই আবার ফিরে আসেন মহাসড়কে। তাঁর ভয়—তিনি না থাকলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সড়কে দাঁড়ানোর জন্য তাঁর যে পোশাক, সেটিও একসময় ধার করা ছিল। পায়ের জুতাও পেয়েছেন অন্যের কাছ থেকে। পরে তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজার রহমান তাঁকে কমিউনিটি পুলিশের একটি জ্যাকেট ও ভেস্ট দেন।

রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারে সহায়তা করছেন শফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি তারাগঞ্জের খিয়ারজুম্মা এলাকায়

শফিকুলের কাজে উপকার পাচ্ছে স্থানীয় শিশুরাও। শিক্ষার্থী নাজমুল হক বলে, ‘আগে রাস্তা পার হতে ভয় লাগত; এখন শফি দাদা থাকায় সুবিধা হয়।’ আরেক শিক্ষার্থী কাইয়ুম ইসলাম বলে, ‘স্কুল থেকে আসার সময় শফি দাদা প্রতিদিন আমাদের হাত ধরে রাস্তা পার করে দেন।’

শফিকুলের  হাতে নেই কোনো সরকারি ক্ষমতা, নেই পদবি বা বেতনের নিশ্চয়তা। আছে শুধু মানুষের প্রতি দায়বোধ। নিজের সংসারে অভাব থাকলেও অন্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। প্রতিদিন শত শত মানুষ তাঁর ইশারায় নিরাপদে রাস্তা পার হন। গন্তব্যে পৌঁছে তাঁরা হয়তো আর পেছনে ফিরে তাকান না; কিন্তু শফিকুল থেকে যান সড়কের পাশে, পরের মানুষটির নিরাপদ পারাপারের অপেক্ষায়। তাই তাঁর পাশে আমাদের সবার থাকা উচিত বলে জানান তারাগঞ্জের মানবকল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য খিয়ারজুম্মা এলাকার বাসিন্দা চন্দন রায়।

শফিকুলের বিষয় নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার নানা কথা হয় ওসি মোস্তাফিজার রহমানের সঙ্গে। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘খিয়ারজুম্মা অত্যন্ত যানজটপূর্ণ এলাকা। হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি শফিকুল স্বেচ্ছায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই একজন মানুষ এভাবে কাজ করছেন, এ জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর কারণে ওই স্থানে মানুষ অনেকটা স্বস্তি পেয়েছে, দুর্ঘটনাও কমেছে।’