বেড়িবাঁধ ভেঙে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। গত রোববার কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নে
বেড়িবাঁধ ভেঙে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। গত রোববার কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নে

‘চোখের সামনে নিজের বসতভিটা সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, কিছুই করতে পারছি না’

কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নের সাগরতীরবর্তী গ্রাম রোমাইপাড়া। বেড়িবাঁধের পাশে থাকা গ্রামটিতে বসবাস করে প্রায় ৪০০ পরিবার। বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এলাকাটিতে কারও ঘর প্লাবিত হচ্ছে জোয়ারের পানিতে, কারও বসতভিটায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। প্রতিমুহূর্তে ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

কেবল এই গ্রামই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে এভাবেই আতঙ্কে রয়েছেন উপজেলার লাখো মানুষ। পাকিস্তান আমলে মাটির বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বারবার এই বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও টেকসই কোনো বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়নি। পুরোনো বেড়িবাঁধ জোড়াতালি দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়; যার কারণে সাগরে প্রতিবছরই ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারাচ্ছে মানুষ।

প্রতিবার যখন ঘর ভাঙে, মনে হয় নিজের শরীরের কোনো একটা অংশ ছিঁড়ে যাচ্ছে। জোয়ার এলে চোখের ঘুম হারিয়ে যায়।
সখিনা খাতুন, বাসিন্দা, কাহারপাড়া, কুতুবদিয়া।

গত রোববার দুপুরে রোমাইপাড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী হাসিনা বেগমের সঙ্গে। সাগরের পাশেই তাঁর ঘর। জানালেন, কয়েক দিন ধরে তাঁর ঘরে সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘সাগরপাড়ে জীবনের এতটুকু সময় কাটিয়ে দিলাম, জীবনে কত ঝড়-জলোচ্ছ্বাস দেখেছি, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে হইনি। চোখের সামনে নিজের বসতভিটা সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, কিছুই করতে পারছি না। ঘরটি নতুন জায়গায় সরিয়ে নেব, সে সুযোগও নেই।’

হাসিনা বেগমের পাশে লবণচাষি শফিকুল ইসলামের ঘর। ঘরের কিছু অংশ এরই মধ্যে ধসে পড়েছে। শফিকুল ইসলাম (৫৮) বলেন, একসময় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে তাঁর পৈতৃক ভিটা ছিল। সেটি সাগরে বিলীন হয়েছে। গত দশ বছরে তিনি পাঁচ জায়গায় বসতবাড়ি স্থানান্তর করেছেন। এখন সর্বশেষ বাড়িটিও সাগরের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কোথায় যাবেন জানেন, সেটি ভেবে কূল পাচ্ছেন না।

রোমাইপাড়া থেকে দক্ষিণ দিকে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের সাইটপাড়া পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার উপকূলে বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, পূর্ব তাবলেরচর, কাহারপাড়া, রোমাইপাড়া, সাইটপাড়া, কাজিরপাড়া; উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের কাইছার বাপেরপাড়া, মিয়ারকাটা, আলী আকবর বলীপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাগরের প্রবল স্রোতে কোথাও বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে, কোথাও ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ভাঙা অংশে জোয়ারের পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে প্লাবিত হচ্ছে অসংখ্য ঘরবাড়ি।

কাহারপাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব সখিনা খাতুন জানান, গত এক দশকে তিনিও তিনবার বাড়ি স্থানান্তর করেছেন। এখন যে ঘরে রয়েছেন, সেটিও ভেঙে যাচ্ছে। সখিনা খাতুন বলেন, ‘প্রতিবার যখন ঘর ভাঙে, মনে হয় নিজের শরীরের কোনো একটা অংশ ছিঁড়ে যাচ্ছে। জোয়ার এলে চোখের ঘুম হারিয়ে যায়।’

পূর্ব তাবলেরচর এলাকার ছমুদা বেগম (৬৫) বলেন, গত শুক্রবারের জোয়ারে তাঁর বসতঘর ভেঙে গেছে। পাশের একটি ঘরে তাঁর পরিবার আশ্রয় নিলেও নতুন ঘর নির্মাণ নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন। আক্ষেপ করে ছমুদা বেগম বলেন, আর কত ঘরবাড়ি বিলীন হলে, কত মানুষের প্রাণহানি হলে এলাকার মানুষ একটি টেকসই বেড়িবাঁধ পাবে।

একই গ্রামের বাসিন্দা আবু তৈয়ব (৫৫) বলেন, ‘নির্বাচন এলে জনপ্রতিনিধিরা বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। পরে আর বেড়িবাঁধের কথা মনে রাখেন না। মাঝখানে দরিদ্র মানুষগুলোর জীবন যাচ্ছে। দিনের জোয়ার কোনোমতে সামলানো গেলেও রাতের জোয়ারে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে। তখন ঘরে ঘরে আতঙ্ক দেখা দেয়, নারী শিশুদের নির্ঘুম রাত কাটে।’

কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবরডেইল ইউনিয়নের পূর্ব তাবলেরচর গ্রামে সাগরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে কবরস্থান। গত রোববার দুপুরে

তাবলেরচরের বেড়িবাঁধের পাশে শত বছরের পুরোনো বায়তুশ শরফ কবরস্থান। কয়েক দিনের জলোচ্ছ্বাসে কবরস্থানের পাশের কিছু অংশ বিলীন হয়েছে। আগামী পূর্ণিমার জোয়ারে কবরস্থানের বাকি অংশও বিলীন হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন এলাকার মানুষ।

আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আকতার কামাল বলেন, গত কয়েক দিনের উচ্চ জোয়ারে শতাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আরও শতাধিক বাড়িঘর বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। কিন্তু এত দিনেও টেকসই বাঁধ হয়নি। যা হয়েছে দায়সারা, অস্থায়ী কাজ। কোথাও জিও ব্যাগ, কোথাও বালুর বস্তা, আবার কোথাও সামান্য মাটি ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুতুবদিয়ার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের ১০টি অংশে মেরামতের কাজ চলছে। তবে নতুন করে পাঁচটি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেখানেও শিগগিরই কাজ শুরু হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের মধ্যে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভাঙা বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহাফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতের মতো টেকসই বা কংক্রিটের স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙা বেড়িবাঁধের দ্রুত সংস্কারের জন্য তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের তাগাদা দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদেও তিনি বেড়িবাঁধের প্রসঙ্গটি তুলেছেন। বর্তমানে কুতুবদিয়ার বেড়িবাঁধের প্রায় ১৫টি অংশে দুই কিলোমিটারের মতো ভাঙা রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অংশে সংস্কারকাজ চলছে, অবশিষ্ট পাঁচটি ভাঙা অংশেও দ্রুত কাজ শুরু হবে।

ভাঙছে দ্বীপ

সাগরবেষ্টিত কুতুবদিয়ার চারদিকে বেড়িবাঁধ আছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এই বাঁধের ২০ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ভাঙা বাঁধ মেরামতের নামে হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।

কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আলম সিকদার বলেন, সাগরে কারও বসতভিটা, কারও চাষের জমি বিলীন হচ্ছে। এতে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো অনেক মানুষ অন্য স্থানে চলে যাচ্ছেন। গত তিন দশকে অন্তত ৪০ হাজার বাসিন্দা দ্বীপ ছেড়েছেন।

২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার ২৫ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুতুবদিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় কুতুবদিয়ার চারপাশে বেড়িবাঁধ রক্ষার ১২ কিলোমিটার প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) ও ঝাউবন ছিল। এখন দ্বীপের পূর্ব-দক্ষিণাংশে তিন কিলোমিটারের মতো প্যারাবন এবং উত্তর-পশ্চিমাংশে দুই কিলোমিটারের মতো ঝাউবাগান রয়েছে। তাও উজাড় করে প্রভাবশালী মহল চিংড়িঘের ও লবণ চাষের মাঠ তৈরি করছেন। এখন যদি ১৯৯১ সালের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এই দ্বীপে আঘাত হানে, তাহলে দ্বীপের অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটবে।

গবেষকেরা বলছেন, পাঁচ দশকে কুতুবদিয়া দ্বীপের মোট স্থলভাগের প্রায় ৬৬ শতাংশ হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় ডিজিটাল শোরলাইন অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিএসএএস) ব্যবহার করে ৪২ বছরের (১৯৭২-২০১৪) তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কুতুবদিয়ার দক্ষিণ দিকে বছরে গড়ে প্রায় ৩৩ দশমিক ৭ মিটার এবং পশ্চিম দিকে ৫ দশমিক ৬ মিটার হারে ভূমি সাগরে বিলীন হচ্ছে, যা দ্বীপের অস্তিত্বের ওপর বড় হুমকি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টের (বর্তমানে কোস্ট ফাউন্ডেশন) আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, যদি ভাঙন অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ৭০ বছরের মধ্যে কুতুবদিয়া মানচিত্র থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। কোস্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুতুবদিয়ার বাসিন্দা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, কুতুবদিয়ার এই ভাঙন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জলবায়ু বিপর্যয়। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক বনাঞ্চল এবং প্রকৃতিনির্ভর সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে দ্বীপটি বাঁচানোর একমাত্র পথ।