
বিকেল গড়ালেই মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ বাগানের ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও বানান। আবার কেউ কেউ গাছ থেকে মাল্টা পেড়ে খেয়ে নিচ্ছেন। যাওয়ার সময় অনেকেই কিনে নিচ্ছেন মাল্টা, গাছের চারা। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই সময়ে এমন দৃশ্য দেখা যায় রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের একটি মাল্টাবাগানে।
বাগানটির মালিক হানিফ আলী মণ্ডল (৩৪)। তাঁর গড়ে তোলা হানিফ মণ্ডল অ্যাগ্রো ফার্ম এখন পরিচিত মাল্টার বাগান হিসেবেই। ১৬ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা এই ফার্মে নানা ফলের গাছ থাকলেও মাল্টার বাগান দেখতেই বেশি ভিড় করেন দর্শনার্থীরা।
হানিফের দাবি, এক মৌসুমে শুধু মাল্টা বিক্রি করে খরচ বাদে তাঁর ১০-১২ লাখ টাকার আয় হয়। আর বছরজুড়ে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের চারা বিক্রি করে আরও ১৫-২০ লাখ টাকা আয় করেন। এসব ফল কিংবা চারা বিক্রি করতে তাঁকে কোনো বাজারে যেতে হয় না, সব বিক্রি হয় বাগান থেকেই।
হানিফ রাজশাহী কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে ২০১৯ সাল থেকে বাড়ির পাশের ১৬ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন কৃষি ফার্মটি। বাগানটিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাল্টা ছাড়াও চায়নিজ কমলা, বারোমাসি কতবেল, পেয়ারা, আনার, বারোমাসি আমড়া ও আমের বাগান আছে। পাশাপাশি রবিশস্যও আবাদ হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য এখান থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের গাছের চারা নেন কৃষক ও নতুন উদ্যোক্তারা।
রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ফতেপুর গ্রামে হানিফের অ্যাগ্রো ফার্মটির অবস্থান। প্রতি শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে বাগানটিতে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।
গত শুক্রবার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, মাল্টার বাগানে দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন দর্শনার্থীরা। তাঁরা ঘুরে ঘুরে মাল্টা দেখছেন। কেউ উদ্যোক্তা হানিফ মণ্ডলের সঙ্গেও ছবি তুলছেন। আর বাগানের দর্শনার্থীদের নিজ হাতে মাল্টা কেটে খাওয়াচ্ছিলেন হানিফ মণ্ডল। ফেরার সময় ২০০ টাকা কেজি দরে মাল্টা নিয়ে যান কয়েকজন দর্শনার্থী। কারও কারও হাতে দেখা যায় মাল্টার কলম করা চারা।
হানিফ জানান, ছোটবেলা থেকেই গাছগাছালির প্রতি একটা ভালো লাগা তৈরি হয়। বাবার বাগান দেখভাল করতে গিয়ে স্নাতকোত্তর আর করা হয়নি। নিজের মধ্যে থাকা স্বপ্ন থেকে এই বাগান গড়ে তুলেছেন।
মাল্টা চাষে খুব বেশি খরচ হয় না জানিয়ে হানিফ বলেন, ২০১৯ সালে তিনি ৯ বিঘা জমি লিজ নেন। পরে আরও ৭ বিঘা লিজ নিয়েছেন। তখন ৯ বিঘায় পেয়ারার বাগান ছিল। পেয়ারাবাগানের ভেতরে তিনি মাল্টাগাছ রোপণ করেন। কয়েক বছর পেয়ারার ফলন পেয়ে তিনি পেয়ারাগাছ কেটে ফেলেন। চার বছর ধরে তাঁর মাল্টাগাছে ভালো ফলন আসছে। সর্বশেষ তিন বছর ধরে তিনি সর্বোচ্চ ফলন পাচ্ছেন।
একটি গাছ থেকে এক থেকে দেড় মণ করে মাল্টা ধরে জানিয়ে বাগানটির মালিক জানান, ফেব্রুয়ারি-মার্চের দিকে মাল্টাগাছে ফুল আসে। তখন একটু স্প্রে করতে হয়। আবার যখন একটু গুটির মতো হয়, তখন স্প্রে করতে হয়। গাছের গোড়া একটু মাটি নরম করে প্রাকৃতিক ও কিছু পরিমাণে রাসায়নিক সার দিতে হয়। এ ছাড়া খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।
সাফল্যের বিষয়ে হানিফ মণ্ডল বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসছেন, বিষয়টি আমাকে বেশ আনন্দ দেয়। আমি এমন কিছু করতে পেরেছি, যা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন, এটা আমার জন্য গর্বের।’
ফেসবুকে হানিফ মণ্ডলের বাগানের ছবি ও ভিডিও দেখে পরিবার নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন স্কুলশিক্ষক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে ছবিগুলো দেখে খুব আকৃষ্ট হয়েছিলাম। বাস্তবেও খুব সুন্দর। নিজেরা গাছ থেকে পেড়ে খাচ্ছি, বাড়ির জন্যও নিচ্ছি। বাজারের ফলের সঙ্গে এর স্বাদের অনেক পার্থক্য। বাজারের ফলে ফরমালিন বা কেমিক্যালের ভয় থাকে, কিন্তু এখানকার ফল একদম তাজা।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, রাজশাহী অঞ্চল মানেই অনেক আম, মনে করে। এখানেও আরও নানা ধরনের ফলের উদ্ভাবন সম্ভব। চারঘাটে মাল্টার ফলন বলে দেয়, এটি রাজশাহীতে সম্ভব। সঠিকভাবে পরিচর্যাসহ চাষ করতে পারলে এটি লাভজনক।