মোহাম্মদ রিমন
মোহাম্মদ রিমন

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন রিমন, অর্থসংকটে দুশ্চিন্তায়

বাবা মোহাম্মদ ইদ্রিচ (৫৮) ভূমিহীন দিনমজুর। কাজ পেলেও অনটনেই চলে সংসার। বড় ভাই মোহাম্মদ রুবেল মৃগী রোগে আক্রান্ত। এ কারণে তিনি কাজ করতে পারেন না। মা ছালমা বেগম গৃহিণী। তিন বছর ধরে তিনি ভুগছেন থাইরয়েডজনিত রোগে। এমন অভাবের সংসারেই বড় হয়েছেন মোহাম্মদ রিমন। সেই অভাব জয় করেই তিনি ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে এখন ভর্তির টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।

রিমনের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম হাইদগাঁও জিয়ার পাড়া গ্রামে। ছোট সেমিপাকা ঘরে তিন ভাই, এক বোন ও মা–বাবাকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। শত কষ্ট আর প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর আগে তিনি পটিয়া হাইদগাঁও উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকেও জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন।

ভর্তি পরীক্ষার মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেও রিমন তাঁর সাফল্য ধরে রেখেছেন। চলতি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের মেধাতালিকায় ৭৪১তম হয়েছেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে ৬৯১তম ও ‘ডি’ ইউনিটে ২ হাজার ৫৮৬তম হয়েছেন। এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও এখন ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

ভালো তরকারির কথা বাদই দিলাম। ঠিকমতো দুই বেলা পেট ভরে ভাত খেতেও কষ্ট হয় আমাদের। তারপরও পড়াশোনা ছাড়িনি।
— মোহাম্মদ রিমন, শিক্ষার্থী

রিমনের এখন স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রশাসন ক্যাডার হওয়া। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি আর পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব—এই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। সুযোগ পেয়েও ভর্তি হতে না পারলে সেটা জীবনের সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হবে।’

অনটনের সংসার, কষ্টের জীবন

পরিবারের অভাবের কারণে রিমনের বড় বোন সোনিয়া বেগমকে এসএসসি পাস করার পরপরই বিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর মেজো ভাই মোহাম্মদ জাভেদ থাকেন নানার বাড়িতে। সেখান থেকেই তিনি পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে জাভেদ গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনিও গুচ্ছভুক্ত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে আর্থিক সংকটের কারণে ভর্তি হতে পারেননি।

রিমনেরও শৈশব-কৈশোরের একটি অংশ কেটেছে বোনের বাড়িতে। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত তিনি বোনের সহায়তায় পড়াশোনা করেছেন। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন অন্যের ঘরে। তখন তাঁদের ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না।

রিমনেরও শৈশব-কৈশোরের একটি অংশ কেটেছে বোনের বাড়িতে। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত তিনি বোনের সহায়তায় পড়াশোনা করেছেন। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্তও পড়েছেন অন্যের ঘরে। তখন তাঁদের ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না।

২০১৬ সালের দিকে তাঁদের জরাজীর্ণ মাটির ঘরটি ভেঙে পড়ে। সে সময় পটিয়ার এক বড় ব্যবসায়ী তাঁদের একটি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে দেন। অনটনের সংসার থাকায় মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি নেন তিনি। প্রায় আট মাস সেখানে কাজ করেন। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন টিউশনে। বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ করে রাত ৯টা পর্যন্ত টিউশন করতেন। এভাবেই সংসার ও নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছেন তিনি।

নিজের অনটনের কথা মনে করে রিমন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভালো তরকারির কথা বাদই দিলাম। ঠিকমতো দুই বেলা পেট ভরে ভাত খেতেও কষ্ট হয় আমাদের। তারপরও পড়াশোনা ছাড়িনি।’

রিমনের শিক্ষাজীবনের সহায়ক ছিলেন তাঁর শিক্ষকেরাও। অষ্টম শ্রেণিতে মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল দের সহযোগিতায় বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পান তিনি। উচ্চমাধ্যমিকে নির্বাচনী পরীক্ষার পর পটিয়া স্বল্প খরচে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টারেও পড়েছেন।

জানতে চাইলে রিমনের মা ছালমা বেগম বলেন, ‘ছেলের পরীক্ষার সময় ভালো খাবার দিতে পারতাম না। ফল প্রকাশের দিন মিষ্টি কিনে খাওয়ানোর সামর্থ্য ছিল না। ভাত খেয়েছি মরিচের গুঁড়া আর পেঁয়াজ দিয়ে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর মতো টাকা আমার নেই। মানুষের সহযোগিতা চাই, যেন আমার ছেলের স্বপ্নটা ভেঙে না যায়।’

হাইদগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল দে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে রিমন আমাদের বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের সালাম করেছে। শত অভাব আর প্রতিকূলতার মধ্যেও যে অধ্যবসায় আর সংগ্রাম সে দেখিয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। রিমন আমাদের গর্ব।’