
‘এই ছোওয়াগুলাকে (বাচ্চাগুলোকে) এতিম করি গেল। এই ছোওয়াগুলার কী হবে এখন? সংসারগুলা ভাসি গেল। যারা এগুলার ব্যবসা করে, তাদের শাস্তি চাই আমরা।’
কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রংপুরে রেকটিফায়েড স্পিরিটের বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়া সদর উপজেলার শ্যামপুর শাহপাড়ার জেনতার আলীর (৪১) ভাবি সীমা আক্তার।
গত রোববার রাতে রংপুরে জেনতার আলী ছাড়া স্পিরিট পানে বিষক্রিয়ায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। তাঁরা হলেন বদরগঞ্জের সোহেল মিয়া (৩০) ও আলমগীর (৪০)।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে জেনতার আলীর বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী আদুরি বেগম (৩০) বাড়ির উঠানে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন। উঠান থেকে বাড়ির ভেতরে রাখা খাটিয়া দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেশীরা জানান, গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ এসে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। জেনতার আলীর বড় ভাই আমজাদ হোসেনসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য সেখানে আছেন। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিয়ে আসার পর পারিবারিক করবস্থানে দাফন করা হবে।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা করে জেনতার আলীর ভাবি সীমা আক্তার বলেন, ‘রোববার দুই–একবার বমি করছিল। রাত ১২টার দিকে চিল্লাচ্ছিল আর কইতেছিল, আমার বুক জ্বলি গেল। কিছুক্ষণ এভাবে চিল্লায়ে রাত দুইটার দিকে মারা গেছে।’
স্থানীয় লোকজন জানান, জেনতার আলীর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। জেনতার আলী কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্বজনেরা।
জেনতার আলীর শাশুড়ি ছালিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাতনি তিনজন। নাতি একটা ছোট দেড় বছরের বাচ্চা। আমার মেয়ে সরল–সোজা, কথা কইতে পারে না মাইনষের সাথে ওইভাবে। এখন কীভাবে চারটা বাচ্চা নিয়ে আমার মেয়ে চলবে? কী করি খাইবে?’
জেনতার আলীর স্বজন ও এলাকাবাসী স্পিরিট বিক্রেতাদের শাস্তি দাবি করেন। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সদর উপজেলার শ্যামপুর এলাকার জয়নুল আবেদিন তাঁর বাড়িতে রেকটিফায়েড স্পিরিট বিক্রি করে আসছিলেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিরা জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে স্পিরিট কিনে পান করেন। পরে বিষক্রিয়ায় তাঁদের মৃত্যু হয়।
শ্যামপুর শাহপাড়া থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে বদরগঞ্জের বসন্তপুর গ্রামে রেকটিফায়েড স্পিরিট পানে মারা যাওয়া সোহেল মিয়া ও আলমগীরের বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সোহেলের বাড়ির সামনে তাঁর মা শেফালী বেগম ছেলের লাশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন।
শেফালী বেগম বলেন, ‘ছেলের মোর জ্বর আসছে। ডাক্তার আননু। দেখি ছেলের প্রেশার ১৬০। ডাক্তার ওষুধ দিয়া বলল, রাইত পোয়ালে রংপুর মেডিক্যাল নিয়ে যান। এরপরে মোর বাচ্চা মারা গেল। আর কিছু কবার পাই না।’
সোহেলের স্ত্রী মোরশেদা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছোট বাচ্চা দুইটা। এখনো তিন মাস হয়নি ছেলে বাচ্চাটার। আমার স্বামী তো এখন মারা গেছে। শ্বশুরবাড়িতে তো সেই অবস্থা নেই। আমার ছইলপইলের কী হবে?’
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। সোহেলের চাচা রেজাউল হক গতকাল একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আটক জয়নুল আবেদিনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’