লেবাননে স্বামীর মৃত্যুর খবরে সাতক্ষীরায় গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি। মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে
লেবাননে স্বামীর মৃত্যুর খবরে সাতক্ষীরায় গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি। মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে

ইসরায়েলি হামলা

সচ্ছলতার আশায় ঋণ করে গিয়েছিলেন লেবাননে, আড়াই মাসে ফিরছেন কফিনে

সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে বড় অঙ্কের টাকা ঋণ করে লেবাননে গিয়েছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার প্রবাসী শফিকুল ইসলাম (৪৫)। প্রতিবেশী আরেক প্রবাসীর মাধ্যমে আড়াই মাস আগে প্রবাসে পাড়ি জমান তিনি। দেশটির একটি ফলের বাগানে শ্রমিকের কাজ করতেন। গতকাল সোমবার দুপুরে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার।

শফিকুলের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে। গতকাল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় রুটি বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় শফিকুলসহ সাতক্ষীরার আরেক প্রবাসী নিহত হন। তাঁরা দুজন একই এলাকায় বসবাস করতেন। নিহত অন্যজন হলেন জেলার আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আবদুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম (৪০)। তাঁদের মৃত্যুর খবরে দুটি গ্রামে মাতম চলছে।

মঙ্গলবার সকালে শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। স্বামীর মৃত্যুর খবরে আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রুমা খাতুন। দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল। এত টাকা ঋণ করে গেল। এখন এই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব? আমার দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’ তিনি স্বামীর লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

নিহত শফিকুল ইসলাম

পরিবার জানায়, আড়াই মাস আগে রোজা শুরুর দুই দিন পর লেবাননের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন শফিকুল ইসলাম। প্রতিবেশী নাহিদুল ইসলামের মাধ্যমে তিনি সেখানে যান। লেবাননে একটি ফলের বাগানে শ্রমিকের কাজ নেন। বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ হয় তাঁর, যার বেশির ভাগই ঋণ।

শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন বারবার ছেলের নাম ধরে ডাকছিলেন। কখনো বিলাপ করছেন, কখনো নির্বাক বসে থাকছেন। বৃদ্ধ বাবা আফসার আলীও বাক্‌রুদ্ধ। আফসার আলী বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। আত্মীয়দের কাছ থেকেও ধার করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলে উপার্জন করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন সে লাশ হয়ে ফিরবে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শফিকুল অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সংসারের অভাব ঘোচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিদেশে গিয়েছিলেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।

ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘শফিকুলের পরিবার অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।